শুক্রবার সারাদিন শিরোনামে সন্দেশখালি। গত তিন ধরে যে ছবি দেখা যাচ্ছিল তা যেন আরও তীব্র আকার ধারণ করল এদিন। তৃণমূলের তিন নেতা শাহজাহান শেখ, উত্তম সর্দার ও শিবু হাজরার বিরুদ্ধে গ্রামবাসীদের অভিযোগের শেষ নেই। দীর্ঘদিনের অত্যাচার সহ্য করার পর ভেঙেছে সহ্যের সীমা। এমনটাই তাঁদের বক্তব্য। যে সন্দেশখালির জনতা জানুয়ারি মাসে ইডির ওপর হামলা করেছিল এই নেতাদের গায়ে আঁচড় লাগার ভয়ে আজ তাঁরাই সম্পূর্ণ বিপক্ষে। তা কেন এই বিক্ষোভ? সন্দেশখালির সারাদিনের চিত্রই বা কেমন ছিল? আসুন দেখি…
আরও পড়ুন: পাকিস্তানের ভোটে রিগিং, গোলাবর্ষণ, আহত ৩ পিটিআই কর্মী


বুধবার রাত থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সন্দেশখালি। উত্তম সর্দার ও শিবু হাজরার বিরুদ্ধে জনতার অভিযোগের তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। প্রথমে শিবু হাজরার একটি পোলট্রি ফার্মে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং ভাঙচুর করা হয় উত্তম হাজরার অফিস। নৌকায় চেপে গ্রাম ছেড়ে পালান দুই নেতা।
বৃহস্পতিবার হাতে লাঠি-বাঁশ নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন গ্রামের মহিলারা। ঘেরাও করা হয় উত্তম ও শিবুর বাড়ি। থানার উদ্দেশ্যে মিছিল করেন তাঁরা। পুলিশের তরফে একশোর বেশি গ্রামবাসীর নামে অভিযোগ দায়ের করা হয়। ৫ জনকে বসিরহাট আদালতে তুলে তাঁদের মধ্যে ৩ জনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। এদিকে আবার শিবু হাজরা ও উত্তম সর্দারের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করেছেন এক মহিলা। ছবিটা এ পর্যন্তই ছিল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত।

শুক্রবার যেন সব বাঁধ ভাঙল। নিজেদের লোকের নাম পুলিশের খাতায় দেখে ফের উত্তেজিত হল সন্দেশখালির জনতা। এদিন জ্বালিয়ে দেওয়া হল জেলিয়াখালি এলাকায় শিবু হাজরার তিনটি পোলট্রি ফার্ম। এরপর প্রায় পাঁচশোর বেশি মহিলা সারাদিন ধরে থানা ঘেরাও করলেন। পুলিশের কর্তারা এসে বোঝালেন এই কাজ আইনবিরুদ্ধ। কিন্তু কোনও কিছুই তাঁরা শুনতে নারাজ।


গ্রামের মহিলাদের সাফ কথা, অনেকদিন ধরে অত্যাচার হয়ে আসছে তাঁদের ওপর। কী সেই অত্যাচার? রাস্তা কেটে ভেড়ি বানানো, তাঁদের জমি কেড়ে নেওয়া, কাজ করিয়ে টাকা না দেওয়া, মহিলাদের অসম্মান। পাশাপাশি, পুকুর বুঝিয়ে বেসরকারি স্কুল নির্মাণের পরিকল্পনা। অভিযোগের অন্ত নেই। আর এখন, প্রতিবাদ করায় তাঁদের বিরুদ্ধেই থানায় কেস! এও কি মেনে নেওয়া সম্ভব? তাই আজ তাঁরা থানার সামনে থেকে এক ইঞ্চি নড়লেন না।

এদিকে আবার, আজ প্রতিবাদকারী গ্রামবাসীদের পিছনে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দৌড়াতে দেখা গেল শাহজাহান শেখের অনুগামীকে। রীতিমতো রাইফেল তুলে সেই ব্যক্তি তেড়ে আসছিলেন। গ্রামবাসীদের দাবি একটাই, শাহজাহান শেখ সহ উত্তম সর্দার ও শিবু হাজরাকে গ্রেফতার করতেই হবে। অবিলম্বে।
আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দুষ্কৃতী, মহিলাদের থানা ঘেরাও, জ্বলন্ত ফার্ম, শুক্রে কত কাণ্ড সন্দেশখালিতে?
প্রথমবার সন্দেশখালি নিয়ে মুখ খুলল তৃণমূল। সাংবাদিক বৈঠক করে মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বললেন, “কিছু মানুষের ক্ষোভ থাকতেই পারে। কোনও মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতেই পারে। কিন্তু এই দু’দিন ধরে যথেষ্ট সংযত ছিল তৃণমূল এবং পুলিশ। সিপিআইএম, বিজেপি এবং কংগ্রেস কিছু মানুষকে উস্কে দিয়ে সেখানে গন্ডগোলের চেষ্টা করছে। এই সমস্যা মিটেও যাবে কয়েকদিনের মধ্যে।”

অর্থাৎ, বিরোধীদের কোর্টেই বল ঠেলে দিল তৃণমূল। পাল্টা বিজেপি ও সিপিআইএমের তরফে বলা হয়েছে, সন্দেশখালির মানুষ অনেক কিছু সহ্য করেছে। এটা জনরোষেরই প্রতিফলন। কিন্তু, শিবু হাজরা, উত্তম সর্দার ও শাহজাহান শেখ এখন কোথায়? তাঁরা কি সন্দেশখালিতেই লুকিয়ে? নাকি পাড়ি দিয়েছেন অন্যত্র? আর তাতে মদত রয়েছে শাসক দলের শীর্ষ নেতাদের? প্রশ্ন এখন অনেকগুলোই, শুধু উত্তর অজানা। অনেকেই আবার কানাঘুষো বলছেন, লোকসভা ভোট আসছে, এই বিরূপ প্রতিক্রিয়া সমাধান করতে হয়তো দাপুটে নেতাদের কুরবানি দিতে পারেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? কী হবে সময় বলবে…







