চিনির দাম নিয়ে চাপ কাটতে না কাটতেই এবার পেঁয়াজের দামে চোখে জল আসার পরিস্থিতি। কলকাতার খুচরো বাজারে পেঁয়াজের দাম ইতিমধ্যেই গুণমানভেদে ৫৫-৬০ টাকা কেজি, আর পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি বদল না হলে আগামী দিনে তা ৭০-৮০ টাকাতেও পৌঁছতে পারে। পুজোর আগে কেন বাড়ছে পেঁয়াজের দাম, উৎপাদন কি সত্যিই কম হয়েছে এবং কবে মিলতে পারে স্বস্তি—নজরে সেই ছবিই।
কয়েক সপ্তাহ আগেও চিনির দাম আচমকা বেড়ে কেজিতে ৭০ টাকা ছুঁয়েছিল। সেই ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই হেঁশেলে নতুন চাপ তৈরি করেছে পেঁয়াজ। দমদমের গোরাবাজারের খুচরো বিক্রেতাদের কথায়, গত বছর এই সময় যেখানে প্রায় ৩০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে, এ বার সেই দাম প্রায় দ্বিগুণ।
পাইকারি বাজারের ছবিও খুব একটা স্বস্তির নয়। কলকাতার পোস্তা ও কোলে মার্কেটের ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আগামী কয়েক দিনে দাম আরও বাড়তে পারে। ইতিমধ্যেই মহারাষ্ট্র থেকে পেঁয়াজের জোগান কমেছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের একাংশের।
কেন বাড়ছে পেঁয়াজের দাম?
পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের একাংশের অভিযোগ, দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় কিছু মজুতদার বাজারে পেঁয়াজ ছাড়ার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিংহ চৌহান (Shivraj Singh Chouhan) এবং কেন্দ্রীয় কৃষিসচিব নিতিন খড়গে (Nitin Kharge)-ও মজুতদারির বিষয়টি সামনে এনেছেন।
তবে শুধু মজুতদারিকে দায়ী করলে পুরো ছবিটা ধরা পড়ে না। প্রতি বছর অগস্ট-সেপ্টেম্বর নাগাদ উৎসবের মরসুমের আগে পেঁয়াজের দামে চাপ তৈরি হওয়ার প্রবণতা থাকে। এ সময় বাংলার বাজার অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে ভিন্রাজ্যের সরবরাহের উপর।
বাংলায় সাধারণত ডিসেম্বরে পেঁয়াজের বীজ রোপণ করা হয়। ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মার্চের গোড়ার দিকে সেই ফসল ওঠে। এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত স্থানীয় উৎপাদনের জোগান বাজারে থাকে। জুলাই পেরোলেই মহারাষ্ট্র, কর্নাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশের মতো রাজ্যের পেঁয়াজের উপর নির্ভরতা বাড়ে।
এ বার সেই জায়গাতেই তৈরি হয়েছে সমস্যা। কোলে মার্কেটের ব্যবসায়ীদের দাবি, মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে আগের তুলনায় কম পেঁয়াজ আসছে। অন্ধ্রপ্রদেশ ও কর্নাটক থেকেও সরবরাহ কমেছে। তার উপর পরিবহণের জ্বালানি খরচ বাড়ায় পাইকারি থেকে খুচরো—দুই বাজারেই তার প্রভাব পড়ছে।
ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, অন্ধ্রপ্রদেশ ও কর্নাটকের পেঁয়াজের দাম ৪০ কেজিতে প্রায় ১,৯০০ টাকা হলে নাসিকের পেঁয়াজের দর প্রায় ২,০০০ টাকা। অর্থাৎ পাইকারি স্তরেই দাম চড়া। মজুত পেঁয়াজের ক্ষেত্রে বড় সাইজের দাম প্রায় ৫০ টাকা, মাঝারি ৪৮ টাকা এবং ছোট পেঁয়াজ ৪৫ টাকা কেজি পর্যন্ত উঠেছে বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।
উৎপাদন কম নয়, সমস্যা গুণমানে
সরকারি হিসাব বলছে, এ বছর দেশে মোট পেঁয়াজ উৎপাদন প্রায় ৩ কোটি ৭ লক্ষ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন। গত বছরের তুলনায় উৎপাদন প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন কম হলেও দেশের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ১৫ লক্ষ মেট্রিক টন পেঁয়াজ রফতানির সুযোগ রয়েছে।
তাহলে সমস্যা কোথায়? কৃষি ও বাজার বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, মূল সমস্যা উৎপাদনের পরিমাণের চেয়ে গুণমানে। দেশের সবচেয়ে বড় পেঁয়াজ উৎপাদক রাজ্য মহারাষ্ট্র। জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশই এই রাজ্য থেকে আসে, যার বড় অংশ নাসিক অঞ্চলে।
এ বছর মহারাষ্ট্রের আবহাওয়াও পেঁয়াজ চাষের পক্ষে খুব একটা অনুকূল ছিল না। এপ্রিলে অসময়ে বৃষ্টি, পরে বর্ষার দেরিতে আগমন এবং তার পর অতিবৃষ্টির জেরে চাষের সময়সূচিতে প্রভাব পড়েছে। ফলে বাজারে ভালো মানের পেঁয়াজের জোগান কমেছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।
কী করছে কেন্দ্র?
পেঁয়াজের দাম বাড়লেই সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারেরও উদ্বেগ বাড়ে। এর রাজনৈতিক প্রভাবের নজিরও রয়েছে। ১৯৮০ সালের লোকসভা নির্বাচনে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়েছিল। আবার ১৯৯৮ সালের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনেও পেঁয়াজের দামকে বিজেপির পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করা হয়েছিল।
এ বার তাই আগেভাগেই সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে কেন্দ্র। চলতি মাসের শুরুতেই মহারাষ্ট্র থেকে ‘কান্দা এক্সপ্রেস’ নামে দু’টি বিশেষ ট্রেনে পেঁয়াজ পাঠানো হয়েছে। একটি ট্রেনে ৪৫০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ গিয়েছে দিল্লিতে। অন্য ট্রেনে প্রায় ৮৪০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ পাঠানো হয়েছে চেন্নাইয়ে।
এর পাশাপাশি দেশের ১৯টি শহরে সড়কপথে আরও ১,০০০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ সরবরাহের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেই তালিকায় রয়েছে কলকাতাও। মোবাইল ভ্যান এবং ন্যাশনাল কোঅপারেটিভ কনজিউমার্স ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (NCCF), ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল কোঅপারেটিভ মার্কেটিং ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (NAFED)-র মতো সরকারি আউটলেটের মাধ্যমে কেজি প্রতি ৩৫ টাকা দরে পেঁয়াজ বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে।
কেন্দ্রের বাফারে বর্তমানে প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ মজুত রয়েছে। যদিও সেই পেঁয়াজের গুণমান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কৃষি মন্ত্রকের কর্তাদের আশা, বাজারে সরবরাহ বাড়লে দাম কিছুটা হলেও কমবে। কিন্তু কলকাতার খুচরো বাজারে এখনও তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব দেখা যায়নি।
ভবানীপুরের যদুবাবুর বাজার থেকে দমদমের গোরাবাজার—এলাকাভেদে ও গুণমান অনুযায়ী পেঁয়াজের দাম প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজির মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।
কবে কমবে দাম?
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, খুব তাড়াতাড়ি পেঁয়াজের দামে বড় স্বস্তি নাও মিলতে পারে। এখন মহারাষ্ট্র, কর্নাটক ও অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে মূলত গত শীতের মরসুমে উৎপাদিত পেঁয়াজই বাজারে আসছে। বর্ষার মরসুমের নতুন ফসল বাজারে ঢুকতে এখনও অন্তত এক থেকে দেড় মাস সময় লাগতে পারে।
সবচেয়ে আগে কর্নাটকের নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে অক্টোবরের আগে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
পুজোর আগে রাজ্যের বাজারে পেঁয়াজের জোগান ধরে রাখতে শীতের মরসুমে উৎপাদিত পেঁয়াজ সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিল রাজ্যের উদ্যানপালন দফতর। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক তপন মাইতির মতে, ২৫০ কুইন্টাল পেঁয়াজ সংরক্ষণের মতো পরিকাঠামো তৈরিতে সরকারি তরফে এক লক্ষ টাকা করে ভর্তুকির কথাও বলা হয়েছিল। তবে সেই পরিকাঠামো বাস্তবে কতটা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বর্ধমান, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, হুগলি ও উত্তর ২৪ পরগনায় শীতের মরসুমে পেঁয়াজ চাষ সম্ভব হলেও বর্ষাকালীন উৎপাদন এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। তপন মাইতির বক্তব্য, ২০২৩-২৪ সালে বর্ষার পেঁয়াজের জন্য যে বীজ দেওয়া হয়েছিল, তার মান যথেষ্ট ভালো ছিল না। এ বছর আবার বর্ষার মরসুমের জন্য কোনও বীজই দেওয়া হয়নি।
ফলে আপাতত ভিন্রাজ্যের পেঁয়াজের উপরই নির্ভর করতে হচ্ছে বাংলার বাজারকে। নতুন মরসুমের ফসল না আসা পর্যন্ত সেই নির্ভরতা কাটার সম্ভাবনাও কম। অর্থাৎ পুজোর বাজারে মধ্যবিত্তের হেঁশেলে পেঁয়াজের ঝাঁঝ আরও কিছুদিন অস্বস্তির কারণ হয়েই থাকতে পারে।



