নজরবন্দি ব্যুরো: পেঁয়াজের দাম (Onion Price) ফের মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে চাপ বাড়াচ্ছে। জাতীয় গড় খুচরো দাম এক বছরে ৪৫ শতাংশ বেড়ে কেজি ৪২ টাকায় পৌঁছেছে, আর দিল্লিতে তা ছাড়িয়েছে ৬৫ টাকা। পরিস্থিতি সামাল দিতে সোমবার থেকেই নাসিকের বাফার স্টক পেঁয়াজ রেলপথে দিল্লি, চেন্নাই, কোচি ও গুয়াহাটির মতো বেশি দামের বাজারে পাঠাবে কেন্দ্র।
কেন্দ্রীয় সরকারের এই বিশেষ রেল পরিষেবার নাম দেওয়া হয়েছে ‘কান্দা এক্সপ্রেস’। মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে পেঁয়াজ সরাসরি বড় مصرفকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়াই এর মূল লক্ষ্য। যেসব বাজারে দাম জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি, সেখানে সরবরাহ বাড়িয়ে খুচরো বাজারের চাপ কমানোর চেষ্টা হবে।
ভোক্তা বিষয়ক দফতরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দেশের গড় খুচরো পেঁয়াজের দাম ছিল প্রায় ৪২ টাকা প্রতি কেজি। এক মাসের তুলনায় দাম বেড়েছে ১৯ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই রান্নাঘরের অন্যতম জরুরি এই সবজির দাম উল্লেখযোগ্য হারে চড়েছে।
দিল্লিতে পরিস্থিতি আরও চড়া। সেখানে পেঁয়াজের দাম প্রায় ৬৫ টাকা কেজি, যেখানে এক বছর আগে দাম ছিল ৩৫ টাকা। চেন্নাইতেও কেজি প্রতি দাম ৫৮ টাকা ছুঁয়েছে, গত বছর একই সময়ে যা ছিল ৩৩ টাকা। কেরল ও অসমের একাধিক বাজারেও পেঁয়াজের দাম জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ভোক্তা বিষয়ক সচিব নিধি খারে (Nidhi Khare) জানিয়েছেন, সরকারি বাফার স্টক থেকে পেঁয়াজ সরিয়ে বেশি দামের বাজারগুলিতে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। সরকারের বক্তব্য, বাজারে চাহিদা মেটানোর মতো পেঁয়াজের জোগান রয়েছে। সরকারি মজুতের পাশাপাশি কৃষকদের কাছেও পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে বাজারে দামের এই উল্লম্ফনের পিছনে মহারাষ্ট্রের খরিফ পেঁয়াজ উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। দেশের অন্যতম প্রধান উৎপাদক রাজ্য মহারাষ্ট্রে কম জমিতে চাষ এবং বর্ষার বৃষ্টিতে দেরির কারণে খরিফ উৎপাদন ৫ থেকে ৭ শতাংশ কমতে পারে বলে বাজার সূত্রে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যদিও কৃষি মন্ত্রকের দ্বিতীয় অগ্রিম হিসাব পুরো দেশের চিত্রে বড় ঘাটতির ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ২০২৫-২৬ ফসল বছরে পেঁয়াজ উৎপাদন আনুমানিক ৩০.৭৩ মিলিয়ন টন, যা ২০২৪-২৫ সালের ৩০.৭৬ মিলিয়ন টনের প্রায় সমান। অর্থাৎ জাতীয় স্তরে উৎপাদন খুব একটা কমেনি, কিন্তু বাজারে সরবরাহের সময়, অঞ্চলভেদে জোগান এবং মজুতের অবস্থান দামের উপর প্রভাব ফেলছে।
মহারাষ্ট্রের লাসালগাঁও (Lasalgaon) পেঁয়াজ বাজারেও দামের চাপ স্পষ্ট। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে পাইকারি দর দ্রুত বেড়েছে। ২২ অগস্টের হিসাবে লাসালগাঁও-নিফাড বাজারে পেঁয়াজের গড় দর প্রায় ৩,৮০০ টাকা প্রতি কুইন্টাল ছিল। অগস্টের শুরুতে এই বাজারে দর ছিল প্রায় ২,১৫০ টাকা কুইন্টালের কাছাকাছি।
সরকার ইতিমধ্যেই বাফার মজুত শক্তিশালী করতে ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল কো-অপারেটিভ মার্কেটিং ফেডারেশন (NAFED) এবং ন্যাশনাল কো-অপারেটিভ কনজিউমার্স ফেডারেশন (NCCF)-এর মাধ্যমে পেঁয়াজ সংগ্রহ করছে। চলতি অর্থবর্ষে এখনও পর্যন্ত প্রায় ১.২ লক্ষ টন পেঁয়াজ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে সরকারি সূত্র উদ্ধৃত করে জানা গিয়েছে।
সংগ্রহ বাড়াতে পেঁয়াজের সরকারি ক্রয়মূল্যও কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে। মে মাসে কুইন্টাল প্রতি ১,২৭০ টাকা থেকে শুরু করে পরে তা ২,১২৫ টাকা করা হয়েছিল; সর্বশেষ তা বাড়িয়ে ২,৬৪৫ টাকা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য, কৃষকদের কাছ থেকে সরকারি বাফারের জন্য আরও বেশি পেঁয়াজ সংগ্রহ করা এবং বাজারে প্রয়োজনে সেই মজুত কাজে লাগানো।
এখন কেন্দ্রের নজর থাকবে বাফার স্টক কীভাবে বাজারে ছাড়া হচ্ছে তার উপর। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ বাজারে না এনে প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে বেশি দামের শহরগুলিতে সরবরাহ করা হবে। এতে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর প্রবণতা থাকলে সেটিও নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা হবে।
এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরেও নাসিক থেকে দিল্লি ও দেশের অন্যান্য বড় ভোগকেন্দ্রে পেঁয়াজ পরিবহণে ‘কান্দা এক্সপ্রেস’ ব্যবহার করেছিল কেন্দ্র। এবার ফের সেই ব্যবস্থার মাধ্যমে সরবরাহ বাড়িয়ে পেঁয়াজের দামে লাগাম টানাই সরকারের লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে, উৎপাদনের জাতীয় হিসাব আপাতত স্বস্তির বার্তা দিলেও আঞ্চলিক সরবরাহের টানাপোড়েন ও বাজারদরের দ্রুত বৃদ্ধি কেন্দ্রকে হস্তক্ষেপে বাধ্য করেছে। সোমবার থেকে ‘কান্দা এক্সপ্রেস’ কতটা দ্রুত বেশি দামের বাজারে পেঁয়াজ পৌঁছে দিতে পারে এবং তার প্রভাব খুচরো দামে কতটা পড়ে, এখন সেদিকেই নজর আমজনতার।



