শৌচাগারে নার্সের দেহ, পাশে ভায়াল! NRS-কাণ্ডে রহস্য ঘনীভূত, পৃথক তদন্তের নির্দেশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

NRS হাসপাতালের HDU-এর শৌচাগার থেকে ৩০ বছরের নার্সের দেহ উদ্ধারের ঘটনায় হোমিসাইড ও ফরেন্সিক তদন্ত চলছে। স্বাস্থ্য দফতরও পৃথক কমিটি গড়ে ৭ দিনের মধ্যে রিপোর্ট চেয়েছে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল (NRS Medical College and Hospital)-এ ৩০ বছরের এক নার্সের রহস্যমৃত্যু ঘিরে তদন্ত আরও জোরদার হয়েছে। বুধবার রাতে স্ত্রীরোগ বিভাগের HDU-এর শৌচাগার থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তাঁর দেহ। ঘটনাস্থলে ভায়াল মেলার তথ্য সামনে আসার পর মৃত্যুর কারণ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি এবার পৃথকভাবে ঘটনার তদন্ত করবে স্বাস্থ্য দফতরও।

বৃহস্পতিবার হাসপাতালে পৌঁছে মৃত নার্সের সহকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। তিনি জানান, ঘটনার স্বাধীন তদন্তের জন্য ইতিমধ্যেই একটি কমিটি তৈরি করা হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে সেই কমিটিকে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।

মৃত নার্স NRS থেকেই নার্সিং পাশ করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে। পড়াশোনা শেষ করে ওই হাসপাতালেই কাজে যোগ দেন তিনি। প্রায় এক বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। বর্তমানে দমদম ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় তাঁর বাড়ি ছিল বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে।

বুধবার রাতে স্ত্রীরোগ বিভাগের HDU-তে তাঁর ডিউটি ছিল। রাত ৮টা থেকে ডিউটি শুরু হওয়ার পর কিছু সময় পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই কাজ করছিলেন তিনি। পরে এক রোগীকে পরিষেবা দেওয়ার পর শৌচাগারে যান বলে তদন্তকারীদের জানিয়েছেন সহকর্মীরা।

এর পর দীর্ঘক্ষণ তাঁর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। এক জুনিয়র চিকিৎসক একটি রোগীর ডেথ সার্টিফিকেট সংক্রান্ত কাজের সময় ওই নার্সকে খুঁজতে গিয়ে বিষয়টি লক্ষ্য করেন। শৌচাগারের দরজা বন্ধ থাকায় সন্দেহ হয় সহকর্মীদের। তাঁরা দরজার বাইরে থেকে ডাকাডাকি করলেও কোনও সাড়া মেলেনি।

শেষ পর্যন্ত পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। দরজা ভেঙে ভিতর থেকে অচেতন অবস্থায় নার্সকে উদ্ধার করা হয়। দ্রুত চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে যাওয়া হলেও তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। পরে তাঁর দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।

ঘটনাস্থল থেকে ভায়াল উদ্ধারের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে সেই ভায়ালে কী ছিল, সেটিই মৃত্যুর কারণ কি না অথবা নার্স নিজে কোনও ওষুধ ব্যবহার করেছিলেন কি না—এই মুহূর্তে কোনও সম্ভাবনাকেই নিশ্চিত করে বলা হচ্ছে না। ময়নাতদন্ত ও ফরেন্সিক পরীক্ষার রিপোর্টের পরেই বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।

নার্সের মৃত্যু আত্মহত্যা কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, অনুমানের ভিত্তিতে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না। পুলিশ এবং ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা তদন্ত করছেন। তাই ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর ধরন নিয়ে কোনও চূড়ান্ত মন্তব্য করতে চাইছে না প্রশাসন।

মৃতার পরিবারের অনুরোধে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়াতেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ফরেন্সিক মেডিসিন বিভাগের প্রধানের তত্ত্বাবধানে ময়নাতদন্ত করা হবে। পরিবারের তরফে যাতে তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন না থাকে, সেই বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশের হোমিসাইড শাখা ইতিমধ্যেই তদন্তে নেমেছে। ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে ফরেন্সিক দলও। নার্স কখন শৌচাগারে গিয়েছিলেন, তার আগে কার সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তাঁর কাছে কী ধরনের ভায়াল ছিল এবং হাসপাতালের ভিতরে তাঁর গতিবিধি কী ছিল—সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এর পাশাপাশি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং স্বাস্থ্য দফতরের নিজস্ব তদন্তও শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, কমিটিতে NRS-এর ফরেন্সিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান, প্রিন্সিপাল, MSVP, নার্সিং সুপার, সাইকিয়াট্রি বিভাগের প্রধান এবং সাফাই কর্মী বিভাগের প্রধান থাকবেন।

এই ঘটনায় পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্যবস্থা, ওষুধ ও ভায়ালের হিসাব এবং ওই রাতে HDU-তে নিরাপত্তা ও নজরদারির পরিস্থিতিও খতিয়ে দেখা হতে পারে। বিশেষ করে কোনও ওষুধ কীভাবে নার্সের হাতে এল এবং তা ব্যবহারের কোনও নিয়ম ভাঙা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ঘটনার পর NRS হাসপাতালের কর্মীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাতের ডিউটিতে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা, হাসপাতালের ভিতরে নজরদারি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অপেক্ষা ময়নাতদন্ত ও ফরেন্সিক রিপোর্টের। পাশাপাশি স্বাস্থ্য দফতরের সাত দিনের তদন্তে কী উঠে আসে, সেদিকেও নজর রয়েছে। নার্সের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনাটির পিছনে কোনও অন্য রহস্য রয়েছে কি না, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন