উত্তরবঙ্গ সফরে চা শ্রমিকদের জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। মঙ্গলবার মূর্তি নদীর উপর নতুন আর্চ ব্রিজ উদ্বোধনের পর তিনি জানান, বন্ধ হয়ে থাকা চা বাগানগুলি খোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি দুর্গাপুজোর আগে চা শ্রমিকদের ২০ শতাংশ বোনাস দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও বলেন তিনি। ইতিমধ্যেই রাজ্য শ্রম দফতর উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলিতে ২০ শতাংশ বোনাস দেওয়ার জন্য অ্যাডভাইজরি জারি করেছে।
চার বছর অপেক্ষার পর মঙ্গলবার মূর্তি নদীর উপর তৈরি নতুন আর্চ ব্রিজটি উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সেতু জলপাইগুড়ির সঙ্গে নাগরাকাটার যোগাযোগ আরও সহজ করবে। লাটাগুড়ি, নাগরাকাটা, লুকসান, মহাবাড়ি-সহ বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের যাতায়াতেও এর প্রভাব পড়বে বলে প্রশাসনের আশা।
সেতু উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে শুভেন্দু জানান, আরও কয়েকটি সেতু তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। গত বছরের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কালীখোলা ব্রিজের কাজও দ্রুত শুরু করার কথা বলেন তিনি। ফলে উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনায় একাধিক পরিকাঠামো প্রকল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এর আগে এদিন কোচবিহারের মদনমোহন মন্দিরে গিয়ে পুজো দেন মুখ্যমন্ত্রী। মন্দিরের উন্নয়ন এবং কোচবিহারকে ধর্মীয় ও প্রাকৃতিক পর্যটনের অন্যতম গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। রেল, সড়ক ও বিমান যোগাযোগের পাশাপাশি পর্যটকদের থাকার জন্য উন্নত আবাসন তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।
চা শ্রমিকদের প্রসঙ্গে শুভেন্দু জানান, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের আওতায় উত্তরবঙ্গের চা শ্রমিকদের কল্যাণে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। গত সপ্তাহেও তিনি জানিয়েছিলেন, কেন্দ্র উত্তরবঙ্গের চা শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের কল্যাণে ৩১৩.৩০ কোটি টাকা অনুমোদন করেছে। ওই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিকাঠামো-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে খবর।
পুজোর আগে বোনাস নিয়ে অবশ্য ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক পদক্ষেপ হয়েছে। উত্তরবঙ্গের পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সের চা বাগানগুলির শ্রমিকদের ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের জন্য ২০ শতাংশ হারে বোনাস দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে রাজ্যের শ্রম দফতর। ফলে চা-বলয়ে পুজোর আগে শ্রমিকদের হাতে বোনাস পৌঁছনোর প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
এরই মধ্যে ডুয়ার্সের কয়েকটি চা বাগানে শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে বোনাসের টাকা ঢুকতে শুরু করেছে। মালবাজারের ওয়াশাবাড়ি চা বাগানের শ্রমিকদের ২০ শতাংশ হারে বোনাস দেওয়া হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বন্ধ চা বাগান পুনরায় চালু করার প্রসঙ্গটিও উত্তরবঙ্গ সফরে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা বাগানগুলির শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে চা-বলয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, তার মধ্যেই পুজোর আগে বাগান খোলার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
কোচবিহারের বিমান যোগাযোগ নিয়েও রাজ্যের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিমানবন্দর সংক্রান্ত সাম্প্রতিক সরকারি আলোচনার সময়সূচি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য এসেছে। ২৮ সেপ্টেম্বর রাজ্যের সঙ্গে কেন্দ্রের UDAN প্রকল্পের অধীনে একাধিক বিমানবন্দর নিয়ে চুক্তির কথা ইতিমধ্যেই জানানো হয়েছে; প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলির মধ্যে হাসিমারা রয়েছে, যা উত্তরবঙ্গের পর্যটন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
উত্তরবঙ্গের পর্যটন সম্ভাবনাকেও এই উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। প্রকৃতি, চা-বাগান, জঙ্গল ও ধর্মীয় স্থানকে কেন্দ্র করে পর্যটন বাড়লে হোটেল, পরিবহণ, রেস্তোরাঁ এবং স্থানীয় ছোট ব্যবসার সুযোগও বাড়তে পারে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন।
ফলে মূর্তি ব্রিজ উদ্বোধনের দিন উত্তরবঙ্গের জন্য একসঙ্গে উঠে এল যোগাযোগ, চা শিল্প, শ্রমিক কল্যাণ ও পর্যটনের একাধিক প্রসঙ্গ। ২০ শতাংশ বোনাসের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এখন নজর থাকবে বন্ধ চা বাগানগুলি খোলার উদ্যোগ এবং ঘোষিত পরিকাঠামো প্রকল্পগুলি বাস্তবে কত দ্রুত এগোয়, সেদিকে।



