দিল্লির ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR (Special Intensive Revision) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) কাছে ব্যাখ্যা চাইল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India)। ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বলে যে শ্রেণিতে ভোটারদের চিহ্নিত করে নোটিস পাঠানো হচ্ছে, তার নির্দিষ্ট অর্থ ও ভিত্তি কী—মঙ্গলবারের শুনানিতে সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে। আদালত এ বিষয়ে কমিশনের জবাব এবং প্রক্রিয়া সংক্রান্ত স্টেটাস রিপোর্ট চেয়েছে।
দিল্লির SIR-এ বর্তমানে প্রায় ৩৩.১৩ লক্ষ ভোটারকে ‘নো ম্যাপিং’ অথবা ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ শ্রেণিতে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩,৭৯,৭৮৫ জনের আগের ভোটার তালিকার সঙ্গে ম্যাপিং পাওয়া যায়নি বলে দেখানো হয়েছে এবং ১৯,৩৩,১৩৪ জনকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই তালিকায় সাধারণ ভোটারের পাশাপাশি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার নামও উঠে এসেছিল। নির্বাচন কমিশন পরে জানিয়েছে, তাঁর ক্ষেত্রে নোটিস জারির পর মাঠপর্যায়ে যাচাই এবং প্রয়োজনীয় নথি পরীক্ষা করা হয়েছে। যাচাইয়ের পর তাঁর ভোটার-এন্ট্রি বৈধ বলে নিশ্চিত করা হয়েছে এবং চূড়ান্ত তালিকায় তা রাখার কথা জানিয়েছে কমিশন।
বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যে আবেদন হয়েছে, সেখানে মূল প্রশ্ন তোলা হয়েছে—কোন নির্দিষ্ট মাপকাঠিতে কোনও ভোটারের তথ্যকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বলা হচ্ছে? আবেদনকারীদের বক্তব্য, নোটিসে অনেক ক্ষেত্রে শুধু অসঙ্গতির কথা বলা হলেও সেই অসঙ্গতির উৎস বা সংশ্লিষ্ট পুরনো রেকর্ডের বিস্তারিত সবসময় স্পষ্ট করা হচ্ছে না।
‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বলতে কী বোঝাচ্ছে?
সহজ ভাষায়, SIR-এর সময় বর্তমান ভোটার সংক্রান্ত তথ্যকে আগের ভোটার তালিকা ও অন্যান্য নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। সেই তুলনায় কিছু তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ভোটারকে যাচাইয়ের জন্য নোটিস পাঠানো হচ্ছে।
দিল্লির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিজের নাম বা বাবা-মায়ের নামের অমিল এই ধরনের নোটিসের অন্যতম কারণ। এছাড়া ভোটার ও তাঁর বাবা-মা বা পূর্বপুরুষের বয়সের ব্যবধান নিয়েও কিছু রেকর্ডকে অসঙ্গতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অর্থাৎ, ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ মানেই ভোটার ভুয়ো বা তাঁর নাম অবৈধ—এমন সিদ্ধান্ত নয়। নির্বাচন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, নোটিস মূলত যাচাই প্রক্রিয়ার অংশ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজের তথ্য ও যোগ্যতার পক্ষে নথি দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দিল্লির খসড়া ভোটার তালিকায় প্রায় ৯৭.৫৪ লক্ষ ভোটারের নাম রয়েছে। তার মধ্যেই ৩৩ লক্ষের বেশি ভোটারকে ‘নো ম্যাপিং’ অথবা ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ সংক্রান্ত যাচাইয়ের আওতায় আনা হয়েছে।
শুধু নোটিস পাওয়ার অর্থ ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ে যাওয়া নয়। দিল্লির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর জানিয়েছে, কোনও ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আগে তাঁকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দিতে হবে এবং কারণ-সহ, আপিলযোগ্য সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তবে এই প্রক্রিয়ার গতি নিয়েও আলাদা প্রশ্ন উঠেছে। ২২ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৩১.৬ লক্ষ নোটিসপ্রাপকের মধ্যে মাত্র প্রায় ২৩ হাজার জনের শুনানি-পর্বে অবস্থান চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়েছে বলে সরকারি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে রিপোর্ট করা হয়েছে। নোটিস-সংক্রান্ত শুনানি ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা এবং চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের নির্ধারিত তারিখ ৪ নভেম্বর।
এর আগে পশ্চিমবঙ্গের SIR নিয়েও ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল। জানুয়ারির শুনানিতে আদালত এই শ্রেণিতে থাকা ভোটারদের নাম প্রকাশ এবং তাঁদের নথি বা আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়ার কথা বলেছিল। আদালতের নথিতে উদাহরণ হিসেবে বাবার নামের অমিল, বাবা-মায়ের বয়সের অস্বাভাবিক পার্থক্য, দাদা-দিদার বয়সের ব্যবধান এবং সন্তানের সংখ্যা সংক্রান্ত কিছু অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
দিল্লির মামলায় তাই মূল প্রশ্ন শুধু কতজনকে নোটিস পাঠানো হয়েছে, তা নয়। কোন তথ্যের ভিত্তিতে কোনও ভোটারকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, সেই মাপকাঠি কতটা স্পষ্ট এবং ভোটারকে নিজের অবস্থান জানানোর জন্য পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া হচ্ছে কি না—সুপ্রিম কোর্টের নজর এখন সেখানেই।



