পাম অ্যাভিনিউয়ের একটা ৪০০ স্কোয়ারফুটের ফ্ল্যাটে গোটা জীবন কাটিয়ে দিলেন রাজ্যের দুই দুই বারের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বর্তমান সময়ে যে কথা হয়তো অনেক জেলাস্তরের নেতারাও ভাবতে পারেননা। চারিদিকের বিপুল আতিশয্য, বিলাসী জীবনকে এক লহমায় দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন বুদ্ধবাবু। আশিটা বছর কাটিয়ে দিলেন সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পড়েই। আজ তাঁর প্রয়াণে আরও বেশি বেশি করে আলোচনা হচ্ছে সেই অনাড়ম্বর জীবন নিয়ে। যদিও এই জীবন কি শুধুই আলোচনা হয়ে থাকবে? বর্তমান প্রজন্ম আদৌ কি কিছু শিখবে তাঁর থেকে?
শুধু মুখে কম্যুনিস্ট বললেই সম্ভবত কম্যুনিস্ট হওয়া যায় না। বরং প্রয়োজন পড়ে যাপনে সেই আদর্শকে বাস্তবায়ন করা। আসলেই, বামপন্থী হয়ে উঠতে হয়। কেউ বামপন্থী হয়ে জন্মায় না। আর এই শিক্ষা দিয়ে গেলেন বুদ্ধদেব। এক দিন, দু’দিন নয়। টানা এতগুলো বছর ধরে সততার সঙ্গে একটা অতি সাধারণ জীবন কাটিয়ে গেলেন বুদ্ধদেব। জীবনের পর মরণেও দেখা গেল একই দৃশ্য। ত্যাগই ছিল তাঁর মূলমন্ত্র। বুদ্ধদেবের প্রয়াণের দিন স্বাভাবিকভাবেই ‘অভিভাবকহীন’ হয়ে পড়ল বামেরা।
আজ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে ভালো সংখ্যায় বাম নেতাকর্মীরা ভিড় করেছিলেন। বুদ্ধদেবের দেহ কাঁধে তুলে বাড়িতে থেকে নিয়ে বেরোলেন নতুন নেতা সৃজন ভট্টাচার্য, শতরূপ ঘোষেরা। সামাজিকমাধ্যমেও বাম সমর্থকরা বুদ্ধবাবুর বিদায় নিয়ে শোকপ্রকাশ করছেন। আগামীকাল বড় মিছিল রয়েছে শহরে। বুদ্ধবাবু যেহেতু দেহদান করে গিয়েছেন তাই আজ পিস সেন্টারেই থাকবে দেহ। আগামীকাল আলিমুদ্দিন ঘুরে শেষ গন্তব্য এনআরএস। এই রকম একটা দিন বামেদের কাছে আবেগের পাশাপাশি একটা শপথের দিন হতে পারে। সকলের অগোচরে পার্টি অফিসে বসেই নতুন লড়াইয়ের ডাক দিতে পারেন কোনও যুব নেতা। বাংলায় কি আবার ক্ষমতায় ফিরতে পারবেন কম্যুনিস্টরা? বুদ্ধবাবুর প্রয়াণের দিন কি আদৌ কোনও শপথ নিয়েছে বামেরা? নাকি শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বুদ্ধিবাবুর প্রতি দেখানো সম্মানের বিরোধিতা করে সমাজমাধ্যমেই শুধু নতুন কোনও হ্যাজ নামতে চলেছে?
সক্রিয় রাজনীতি থেকে অনেক দিন আগেই বিদায় নিয়েছেন বুদ্ধবাবু। ২০১১ সালে যাদবপুর কেন্দ্রে হারার পর থেকেই সেভাবে দলের সক্রিয় কোনও কর্মসূচিতে দেখা যায়নি তাঁকে। যদিও আলিমুদ্দিনে যেতেন বই পড়তে। ফুসফুসের সমস্যা ছিল বহুদিনের। সেভাবে দলের মিটিং-মিছিল গুলিতেও যেতে পারতেন না ভগ্নস্বাস্থ্যের জন্য। শেষবার দলীয় কর্মসূচিতে দেখা গিয়েছিল ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ১২ মিনিট বক্তব্য রেখেছিলেন।
এই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নামের আগেই বিতর্কিত শব্দটি যুক্ত হয় ২০০৭ সালে। সেই সময় রতন টাটাকে সিঙ্গুরে টাটা গোষ্ঠীর এক লক্ষ টাকার গাড়ি কারখানা নির্মাণ করতে চান তিনি। স্লোগান ছিল ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ’। কিন্তু, জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় বিতর্ক। বিরোধী নেত্রী হিসাবে বুদ্ধদেবের বিপক্ষে ছিলেন রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ নন্দীগ্রামে গুলি চালায় পুলিশ। সংঘর্ষে নিহত হন ১৪ জন গ্রামবাসী। এই ঘটনায় পরবর্তীতে দুঃখপ্রকাশ করেন তিনি।
এরপর ২০১১ সাল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে হারিয়ে ক্ষমতায় আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুদ্ধদেবই বামেদের শেষ অভিভাবক। এগারো সালের পর থেকে ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু বাম শক্তি। এই মুহূর্তে রাজ্যে তাঁদের আসন সংখ্যা শূন্য। বুদ্ধদেব আর বামেদের প্রত্যাবর্তন দেখতে পারলেন না। তার আগেই চলে যেতে হল। অনেক বামপন্থী এখনও বিশ্বাস করেন, সাদা চুলের এই ভদ্রলোক যদি একবার সুস্থ হয়ে মাঠে নামতেন তাহলে হয়তো ভোটের অঙ্কে শূন্য হয়ে যাওয়া সিপিআইএম আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারত।
১৯৬৬ সালে সিপিআইএমের সদস্যপদ গ্রহণ করেন বুদ্ধদেব। দু’বছরের মাথায় তাঁকে গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের রাজ্য কমিটির সম্পাদক করার সিদ্ধান্ত নেয় বাম নেতৃত্ব। আরও তিন বছর পর তিনি হন বঙ্গ সিপিআইএম কমিটির একজন সদস্য। ১৯৭৭ সালে কাশীপুর কেন্দ্র থেকে প্রথমবারের জন্য নির্বাচনে জেতেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের মন্ত্রী করা হয় তাঁকে। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে যাদবপুর কেন্দ্র থেকে জিতে হন রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এই দুই দপ্তরের পাশাপাশি ১৯৯৯ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথা বর্ষীয়ান বাম নেতা জ্যোতি বসু বুদ্ধদেবকে উপমুখ্যমন্ত্রীর পদে নিয়ে আসেন। এর এক বছর পর জ্যোতি বসুর অবসর নেন এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে প্রথমবারের জন্য শপথ গ্রহণ করেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। এরপর টানা ১১ বছর বাংলার দায়িত্বে ছিলেন তিনি।



