নতুন বছর থেকেই ভারতে বিমানযাত্রার টিকিটের ভাড়া নির্ধারণে বদল আসতে চলেছে। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে চলেছে ‘ভারতীয় বায়ুযান নিয়ম, ২০২৬’ (Indian Aircraft Rules, 2026)। নতুন নিয়মে যাত্রী চাহিদা ও পরিচালন খরচের ভিত্তিতে টিকিটের দাম নির্ধারণ করতে পারবে বিমান সংস্থাগুলি। তবে তার অর্থ এই নয় যে, ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়ানোর সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পাচ্ছে বিমান সংস্থাগুলি। বিশেষ পরিস্থিতিতে বা জনস্বার্থে প্রয়োজন হলে ভাড়ার বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারবে কেন্দ্রীয় সরকার। পাশাপাশি টিকিটের দাম ও আনুষঙ্গিক চার্জ প্রকাশের ক্ষেত্রেও বাড়ছে স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতা।
নতুন ব্যবস্থায় বিমানের ভাড়ার নির্দিষ্ট ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দিচ্ছে না সরকার। অর্থাৎ, চাহিদা, রুটের পরিস্থিতি এবং পরিচালন ব্যয়ের মতো বিষয় বিবেচনা করে সংস্থাগুলি নিজেদের ভাড়া নির্ধারণ করতে পারবে। তবে এই ভাড়া নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নজরদারির বাইরে থাকবে না।
নতুন নিয়মে বিমান সংস্থাগুলিকে নিজেদের নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা অসামরিক বিমান পরিবহণের নিয়ামক সংস্থা ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল অ্যাভিয়েশন (Directorate General of Civil Aviation বা DGCA)-এর কাছে জমা দিতে হবে। কোন পদ্ধতিতে এবং কত সময় অন্তর এই তথ্য জমা দিতে হবে, তা নির্ধারণ করবে নিয়ামক সংস্থা। পাশাপাশি, সাধারণ মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দিতে নিজেদের ওয়েবসাইট বা নির্দিষ্ট ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করতে হবে বিমান সংস্থাগুলিকে।
যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসছে টিকিটের মোট খরচ প্রকাশের নিয়মে। এত দিন অনেক ক্ষেত্রে টিকিটের প্রাথমিক দাম দেখার পর বুকিংয়ের শেষ পর্যায়ে গিয়ে বিভিন্ন অতিরিক্ত চার্জ যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে যাত্রীদের। নতুন নিয়মে বুকিংয়ের ওয়েবসাইট এবং ইস্যু করা টিকিট—দুই জায়গাতেই মোট কত টাকা দিতে হবে, তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
শুধু মোট দাম দেখালেই চলবে না। বেস ফেয়ার বা মূল ভাড়া, সরকারি কর, বিভিন্ন পরিষেবা সংক্রান্ত ফি, টিকিট বাতিলের চার্জ, টাকা ফেরতের শর্ত এবং অন্য কোনও অতিরিক্ত খরচ থাকলে তার পৃথক বিবরণ দিতে হবে। ফলে টিকিট কাটার আগেই কোন খাতে কত টাকা দিতে হচ্ছে, তা বুঝতে পারবেন যাত্রীরা।
সরকারের এই পদক্ষেপের অন্যতম উদ্দেশ্য বিমান ভাড়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়ানো। বিশেষ করে উৎসবের মরশুম, ছুটির দিন কিংবা কোনও আকস্মিক পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট রুটে যাত্রীর চাহিদা বেড়ে গেলে টিকিটের দাম দ্রুত বাড়তে দেখা যায়। নতুন নিয়মে স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতিতে ভাড়া নির্ধারণের স্বাধীনতা বিমান সংস্থাগুলির হাতেই থাকছে। তবে অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে জনস্বার্থ রক্ষার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ রাখা হয়েছে।
নতুন নিয়মের ১৯২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনও অসাধারণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় সরকার মনে করলে লিখিত নির্দেশ জারি করতে পারবে। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুযায়ী সেই নির্দেশ কার্যকর করতে হবে এবং পদক্ষেপ হতে হবে প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই ধরনের নির্দেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য বহাল থাকবে না; নির্দিষ্ট সময়ের জন্যই কার্যকর হবে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। নতুন নিয়মে প্রতিটি রুটের জন্য নির্দিষ্ট টিকিটের দাম বেঁধে দেওয়া হয়নি। আবার কোনও পরিস্থিতিতে কত টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া যাবে, তার নির্দিষ্ট অঙ্কও ঘোষণা করা হয়নি। অর্থাৎ, প্রতিদিনের বিমান ভাড়ার উপর স্থায়ী সরকারি নিয়ন্ত্রণ চালু হচ্ছে না। বরং অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে থাকছে।
ভারতের বিমান পরিবহণ ব্যবস্থায় এই পরিবর্তন কার্যকর হলে যাত্রীদের সামনে ভাড়ার হিসাব আরও পরিষ্কার হওয়ার কথা। বিশেষ করে বুকিংয়ের সময় মূল ভাড়া ও অন্যান্য চার্জ আলাদা করে দেখতে পাওয়া গেলে বিভিন্ন বিমান সংস্থার টিকিটের খরচ তুলনা করা সহজ হবে। তবে বাস্তবে ভাড়ার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঠেকাতে কেন্দ্র কতটা এবং কীভাবে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তার উপরই নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকটা নির্ভর করবে।
‘ভারতীয় বায়ুযান নিয়ম, ২০২৬’ প্রকাশিত হয়েছে ৩১ অক্টোবরের সরকারি গেজেটে। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন নিয়ম কার্যকর হবে। ফলে নতুন বছর থেকেই বিমান সংস্থাগুলিকে ভাড়া প্রকাশ, তথ্য জমা এবং যাত্রীদের সামনে খরচের পূর্ণাঙ্গ হিসাব তুলে ধরার ক্ষেত্রে নতুন বিধি মেনে চলতে হবে।



