নেতাজি ও বর্তমান ভারত: স্বাধীনতার নায়ক কি আজও আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবেক?

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শ কি আজকের ভারতের রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা ও জাতীয়তাবাদে প্রতিফলিত হচ্ছে? বর্তমান ভারতের সঙ্গে নেতাজির স্বপ্নের তুল্যমূল্য বিচার।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

স্বাধীনতার ৭৭ বছর পর দাঁড়িয়ে আজও ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক চর্চায় বারবার ফিরে আসে এক নাম—নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। তিনি কি শুধুই ইতিহাসের পাতায় বন্দি এক বীর, না কি আজকের ভারতেও তাঁর চিন্তা, দর্শন ও সাহস সমান প্রাসঙ্গিক? যখন জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রশক্তি, যুবসমাজের ভূমিকা এবং ভারতের বৈশ্বিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তুঙ্গে—ঠিক তখনই প্রশ্ন উঠছে, বর্তমান ভারত কি নেতাজির স্বপ্নের ভারতের কাছাকাছি, নাকি আমরা তাঁর আদর্শ থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছি?

নেতাজি ছিলেন আপসহীন দেশপ্রেমের প্রতীক। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই ছিল শুধু রাজনৈতিক নয়, মনস্তাত্ত্বিকও। তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বাধীনতা ভিক্ষা নয়—তা ছিনিয়ে নিতে হয়। আজকের ভারতে সেই আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়—বিশেষ করে কূটনীতি, প্রতিরক্ষা ও বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে।

তবে নেতাজির জাতীয়তাবাদ ছিল সর্বজনীন। ধর্ম, ভাষা বা জাতির বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি ভারতীয় পরিচয়কে অগ্রাধিকার দিতেন। আজকের ভারতে যখন পরিচয়ের রাজনীতি, মেরুকরণ ও মতভেদের ভাষা ক্রমশ তীক্ষ্ণ হচ্ছে, তখন নেতাজির সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদ নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

নেতাজি যুবসমাজকে ভারতের ভবিষ্যৎ বলে মনে করতেন। আজাদ হিন্দ ফৌজে তরুণদের নেতৃত্বে সামনে এনে তিনি প্রমাণ করেছিলেন—দেশ গঠনের ভার নতুন প্রজন্মের হাতেই। বর্তমান ভারতেও যুবসমাজ বৃহত্তম শক্তি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—তাদের কি শুধুই ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে দেখা হচ্ছে, নাকি সত্যিই নেতৃত্বের জায়গা দেওয়া হচ্ছে?

রাষ্ট্রশক্তির প্রশ্নে নেতাজি ছিলেন বাস্তববাদী। তিনি জানতেন, শক্তিশালী সেনাবাহিনী ও সংগঠিত রাষ্ট্র কাঠামো ছাড়া স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা সম্ভব নয়। আজকের ভারত প্রতিরক্ষা ও আত্মনির্ভরতার পথে এগোলেও, একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সমালোচনার মুখে পড়ছে। এখানেই নেতাজির দর্শন নতুন প্রশ্ন তোলে—শক্তিশালী রাষ্ট্র মানেই কি কঠোর রাষ্ট্র?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, নেতাজি কখনও ব্যক্তিপূজার রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন না। তিনি প্রতিষ্ঠান, আদর্শ ও দায়িত্ববোধের কথা বলতেন। আজকের ভারতে যখন রাজনীতি ক্রমশ ব্যক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, তখন নেতাজির এই চিন্তাভাবনা আমাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়।

নেতাজি ও বর্তমান ভারতের সম্পর্ক তাই আবেগের নয়, আত্মবিশ্লেষণের। তাঁর আদর্শকে স্মরণ করা মানে শুধু মূর্তি বা অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধা নয়—বরং প্রশ্ন করা, আমরা কোন পথে এগোচ্ছি এবং সেই পথে নেতাজির ভারত কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত