রাজনৈতিক মঞ্চে এর পরে হয়তো আরও বেশি বক্তৃতা রাখবেন। গেরুয়া রঙের স্বার্থে। কিন্তু ভারতীয় সংবিধানের একজন সাংসদ, গৌরবান্বিত সংসদে দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের শেষবারের মতো যা যা বলার ছিল বলে ফেললেন। নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi), এদিন দু’ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ভাষণ দিলেন সংসদে। পুরো সময়টা জুড়ে গলায় ছিল আত্মবিশ্বাসের সুর। বুঝিয়ে দিচ্ছেন, আবারও এই সংসদের ঠিক এখানেই তিনি দাঁড়িয়ে থাকবেন। দিশা দেখাবেন। আর উল্টো দিকের মানুষগুলো তখনও সময়কে পরোয়া না করে তাঁর বলে যাওয়া কথাগুলো নীরবে শুনে যাবেন।
আরও পড়ুন: অভিষেক-মমতার সঙ্গে বৈঠক, সব জল্পনা কাটিয়ে থেকে গেলেন দেব
লোকসভার আগে অধিবেশনের শেষ দিন মোটামুটি বিজেপি সাংসদরা প্রত্যেকেই উপস্থিত ছিলেন। বলা যেতে পারে, হাউসফুল পার্লামেন্ট। বিরোধীদের মধ্যেও সনিয়া গান্ধী, অধীর রঞ্জন চৌধুরী ছিলেন। ফলে এদিন উন্নয়নের পাশাপাশি আগামী নির্বাচনকে মাথায় রেখে সুকৌশলে বিপক্ষকে ধূলিস্যাৎ করে দিলেন নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। তাও চিরকালীন রগুড়ে স্বভাব দিয়ে। বিরোধীদের একটা কথা যে তাঁর খুব গায়ে লেগেছে তাও স্পষ্ট করে দিলেন। ‘মোদী কা কবর খুদায়েঙ্গে’, তারপরই নিজেকে দেখিয়ে বললেন শত খারাপ চাওয়া সত্ত্বেও তিনি কি করে বহাল তবিয়তে রয়েছেন! আসলে, তাঁর মতে, কারুর খারাপ চাওয়া ভালো, তাতে আখেড়ে ভালোই হয়।

নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) নিজেও হয়তো জানেন ২০২৪ সালে জিতে তিনি যদি তৃতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রীও হন। তাও একটা প্রশ্ন উঠেছে ইতিমধ্যেই। মোদীর বিকল্প কে? যদিও তিনি জানেন এটা ভাবার জন্য এখনও পাঁচ বছর সময় আছে। তবু মোদী সেই বেছে নিলেন নিজের সময়সীমাকেই। ২০২৮ সালের ভারতকে তিনি দেখতে পারছেন আর সেটারই রূপায়ন করার চেষ্টা করলেন শব্দে। পরবর্তী নির্বাচন অর্থাৎ ২০২৯ সালে গিয়ে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে আরও প্রবল ভাবে যে, মোদী (Narendra Modi) ছাড়া বিজেপি কি পারবে? হয়তো সত্যিই মোদীর বিকল্প মুখ খুঁজবে বিজেপি। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের পরামর্শও থাকতে পারে।

এই অধিবেশনের মূল বিষয় ছিল বিগত পাঁচ বছরের খতিয়ান পেশ। আর এই পাঁচ বছরের মধ্যেই কিন্তু করোনাকাল দেখেছে দেশ। সেই কারণেই মহামারীর কথা বারবার বললেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে সমস্ত সাংসদদের ধন্যবাদ জানালেন সেই কঠিন সময় নিরন্তর ভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবার জন্য। বললেন, ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে। ব্যাংকিং সেক্টরে ভারতবর্ষের মুনাফা যে দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে তাও স্মরণ করালেন। করোনাকাল পেরিয়ে আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরেছে। কিন্তু দেশকে পিছিয়ে না পড়তে দেওয়ার ভার ছিল সরকারের হাতে। সেখান থেকে দেশকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কুপ্রভাব পড়তে না দেওয়া তা যে কিভাবে সম্ভব হয়েছে সে কথা জানা গেল অধিবেশনের শেষ বেলায়, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে।
অধিবেশনের সমাপ্তি বক্তৃতায় ২০২৮ সালের ‘ভারত’ দেখালেন মোদী
নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) স্পষ্ট করে দিলেন ২০২৪ সালে এনডিএ সরকারই ক্ষমতায় আসছে। বিরোধীদের যে বর্তমান অবস্থা তা যে কতটা অগোছালো এবং দিশাহীন তাও প্রমাণ করে দিলেন। একটা সময় মোদীর বক্তব্য শুনতে শুনতে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল বিরোধীদের। শুনতে শুনতে মাথায় হাত দিয়ে রেখেছিলেন অধীর চৌধুরী। সেখানে একের পর এক বাক্যের পর আওয়াজ তুলছিলেন বিজেপি সাংসদরা। মোদীর প্রতিটি বাক্যের অন্তরালে লুকিয়ে ছিল একটি করে অট্টহাস্য! কারণ, উন্নয়নের পক্ষে মোদীর পাল্লা ছিল ভারী। আর বিরোধীদের নীরবতা অনৈক্যতা ছিল মোদীর ভাষণের উড়ানশক্তি। তাই তাঁকে আজ থামতে হল না। বলে চললেন। একেবারে যেন থামিয়ে দিলেন।

চন্দ্রযান সাফল্য থেকে জি-টোয়েন্টি সামিট একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগের কথা তো ছিলই। আগামী দিনের পরিকল্পনা এবং ভারতবর্ষকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দেশ হিসেবে প্রমাণ করতে তাঁর যে মানসিকতা একই থাকবে তা বুঝিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী। এখনও কাজ বাকি আছে এবং সেই কাজ হয়তো তাঁর হাত ধরেই হবে বুঝতে পারেন তিনি। তাই তো স্পষ্ট করে বলতে পারেন, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ইতিহাস সৃষ্টি হবে। গেরুয়া জলে থৈ পাবে না কেউ!
আপাতত অধিবেশন শেষ। শুরু হবে লোকসভার প্রচার। সেখানে সাধারণ মানুষের সামনেও একই মেজাজে হয়তো বক্তৃতার করবেন নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু জনগণ আর রায় এই দু’টো শব্দ যেকোনো মুহূর্তে যে খেলা ঘুরিয়ে দিতে পারে তা কিছুটা হলেও ভাববেন বোধহয়। তবে, বিজেপি সরকারের পতন যে এই মুহূর্তে সম্ভব না তা জানেন মোদী। যদি বিজেপি যেতে তাহলে শপথের পর আবার এখানেই এই বছর দেখা যাবে নরেন্দ্র মোদীকেই (Narendra Modi)। সেক্ষেত্রে আবারও সংসদে পাওয়া যাবে তাঁকে।



