নানুর আবারও রক্তাক্ত। শান্ত গ্রামের রাত ভেঙে আচমকা চিৎকার আর অস্ত্রের ঝনঝনানি। শুক্রবার রাতে থুপসড়া অঞ্চলের পাতিছাড়া গ্রামে গ্রামবাসীদের সাধারণ আড্ডা মুহূর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। সেই অমানবিক আক্রমণের শিকার হয়ে মারা যান তৃণমূলের বুথ সভাপতি রাসবিহারী সর্দার (দোদন)। আরও পাঁচজন গুরুতর জখম হয়ে হাসপাতালে জীবনযুদ্ধে লড়ছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায় বোঝা যায়, নানুরের এই হামলা এতটাই দ্রুত ঘটে যে পালানোর বা প্রতিরোধের কোনও সুযোগই মেলেনি। রাতের অন্ধকারে আচমকা দু’পক্ষের তীব্র বচসা শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যে একদল দুষ্কৃতী লোহার রড, শাবল ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে নির্বিচারে মারধর শুরু করে। রাসবিহারীকে মাটিতে ফেলে একের পর এক কোপানো হয়। তাঁকে বাঁচাতে গেলে আরও পাঁচজনকেও আঘাত করে দুষ্কৃতীরা।
নানুরে ফের রক্তাক্ত সংঘর্ষ, আড্ডার মাঝেই খুন তৃণমূলের বুথ সভাপতি
গুরুতর আহত অবস্থায় তৃণমূল নেতাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে পাঁচজন আহত এখন পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোট ব্লক হাসাপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
মৃতের ছেলে মানব সর্দারের বর্ণনা হৃদয়বিদারক। তাঁর কথায়, পার্টি অফিস থেকে নাটমন্দিরের পথে এসে হামলার মুখে পড়েন বাবা। রড–শাবলের কোপে সেখানেই লুটিয়ে পড়েন। পরিবারের দাবি, এই হামলা আকস্মিক নয়, পরিকল্পিতও হতে পারে। তাঁরা থানায় FIR দায়ের করেছেন এবং হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি তুলেছেন।
ঘটনার পর মুহূর্তে নানুরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় নানুর থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী। এলাকা ঘিরে তল্লাশি শুরু হয়, দুষ্কৃতীদের খোঁজে গ্রামজুড়ে অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, গ্রাম্য দ্বন্দ্ব ও পুরনো বিবাদের জেরেই এই রক্তাক্ত আক্রমণ হতে পারে। তবে রাজনৈতিক রং নিয়েও প্রশ্ন উঠছে, কারণ আক্রান্ত ব্যক্তি শাসকদলের সক্রিয় বুথ সভাপতি ছিলেন।
এই ঘটনার সময় নাটমন্দিরে গ্রামবাসীদের আড্ডা চলছিল। বহু মানুষ উপস্থিত থাকলেও হামলাকারীরা দ্রুত চম্পট দেয়। স্থানীয়দের মত, ঘটনাটি এতটা সংগঠিত ও দ্রুত ছিল যে আক্রমণকারীরা আগে থেকেই পরিকল্পনা করে এসেছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে নানুর এলাকায় একাধিক বিক্ষিপ্ত অশান্তি দেখা গিয়েছে। ফলে এই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে নতুন করে নিরাপত্তা প্রশ্নে উদ্বেগ বাড়ছে। গ্রামবাসীদের একাংশ মনে করছেন, এই হামলা শুধু বচসার জেরে হতে পারে না; এর নেপথ্যে বৃহত্তর উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
শনিবার মঙ্গলকোট হাসপাতালে রাসবিহারীর দেহের ময়নাতদন্ত হবে। এর পর তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হবে গ্রামে, যেখানে এখনই উত্তেজনা চরমে।
নানুর যেন আবারও হয়ে উঠেছে বাংলার রাজনৈতিক অশান্তির প্রতিচ্ছবি—যেখানে গ্রাম্য আড্ডাও হয়ে উঠছে মৃত্যুফাঁদ। পুলিশের তদন্তে সামনে আসে কি প্রকৃত কারণ, এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা এলাকা।



