নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে উপনির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হতেই তৃণমূলের অন্দরের পুরনো প্রতীক-সংঘাত ফের সামনে চলে এল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ী ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-অনুগামী দুই শিবিরই ভোটে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু জোড়াফুল প্রতীক শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।
রাজ্যে পালাবদলের পর তৃণমূল কংগ্রেসের ভাঙন আরও স্পষ্ট হয়েছে। দলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ, জোড়াফুল প্রতীক এবং দলীয় ফান্ড—সবকিছু নিয়েই দুই শিবিরের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে। বিধানসভা উপনির্বাচনের ঘোষণা সেই দ্বন্দ্বকে এবার সরাসরি ভোটের ময়দানে নিয়ে এল।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের ফসল তৃণমূল কংগ্রেস। তাঁর নেতৃত্বেই ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর দলকে একসঙ্গে ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। তৃণমূলের টিকিটে নির্বাচিত একাধিক বিধায়ক ধীরে ধীরে মমতার পাশ থেকে সরে গিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরে যোগ দিয়েছেন।
বর্তমানে বিধানসভায় বিরোধী শিবিরে ঋতব্রতপন্থীদেরই প্রাধান্য রয়েছে এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতিও দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, লোকসভার সাংসদদের একটি বড় অংশও মমতার শিবির ছেড়ে এনডিএকে সমর্থনের অবস্থান নিয়েছেন। সেই রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়েও অবশ্য জটিলতা এখনও কাটেনি।
এই পরিস্থিতিতে ‘আসল তৃণমূল’ কারা, তা নিয়ে দুই পক্ষের দাবি-পাল্টা দাবি নতুন করে তীব্র হয়েছে। আর সেই লড়াইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের নির্বাচনী প্রতীক। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে উপনির্বাচন ঘোষণার পর জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে দুই শিবিরের অবস্থান কার্যত মুখোমুখি।
ঋতব্রতপন্থী শিবিরের বিধায়ক সন্দীপন সাহার দাবি, তাঁরা ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় নথিপত্র নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দিয়েছেন। তাঁদের আশা, কমিশনের সিদ্ধান্ত তাঁদের পক্ষেই যাবে। তাঁর বক্তব্য, প্রার্থী বাছাইয়ের কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে এবং জোড়াফুল প্রতীক নিয়েই তাঁদের প্রার্থী ভোটে লড়বেন।
অন্যদিকে, মমতাপন্থী শিবিরও প্রতীক নিয়ে বিন্দুমাত্র পিছিয়ে নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ নেতা ও বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, তৃণমূল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরই তৈরি করা দল। তাঁর নেতৃত্বেই দল তিনবার ক্ষমতায় এসেছে। ফলে জোড়াফুল প্রতীকের দাবিও তাঁদেরই।
অর্থাৎ, নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনে দুই শিবিরই নিজেদের প্রার্থীকে একই প্রতীকে লড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যালটে জোড়াফুল প্রতীক কার প্রার্থীর পাশে থাকবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখন নির্বাচন কমিশনের হাতেই।
আইন অনুযায়ী, কোনও স্বীকৃত রাজনৈতিক দল ভেঙে একাধিক অংশে ভাগ হয়ে গেলে দলের নাম ও সংরক্ষিত নির্বাচনী প্রতীক ব্যবহারের অধিকার কোন অংশের থাকবে, তা নির্ধারণ করার এক্তিয়ার নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। ফলে নন্দীগ্রামের ভোটের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই তৃণমূলের দুই শিবিরের মধ্যে যে প্রতীক-যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তার চূড়ান্ত ফল এখন কমিশনের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল।
উপনির্বাচনের ময়দানে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি দুই পক্ষেরই থাকলেও জোড়াফুল প্রতীক ছাড়া সেই লড়াই কতটা জমবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। কমিশনের সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেবে, নন্দীগ্রামে ‘তৃণমূল’ নাম এবং জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে শেষ পর্যন্ত কে ভোটে নামতে পারবে।



