ব্রহ্মসের ঘেরাটোপে চিন! দক্ষিণ চিন সাগরে বন্ধু দেশগুলিকে হাতিয়ার করে নতুন চাল ভারতের

দক্ষিণ চিন সাগরে চিনের প্রভাব মোকাবিলায় সরাসরি বাহিনী না পাঠিয়ে ব্রহ্মসকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে ভারত।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

দক্ষিণ চিন সাগর থেকে ভারত মহাসাগর—এশিয়ার সমুদ্রপথে চিনের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাল্টা কৌশল সাজাচ্ছে ভারত। সরাসরি কোনও সংঘাতে না গিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন সমীকরণ। আর তার কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্রহ্মস (BrahMos)। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপিন্সের পর আরও কয়েকটি দেশ এই অস্ত্রের দিকে ঝুঁকলে দক্ষিণ চিন সাগরে চিনের উপর কৌশলগত চাপ আরও বাড়তে পারে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘তাইওয়ান টকস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল পিআর শংকর এই কৌশলকেই ‘ব্রহ্মস বেল্ট’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, বিষয়টি শুধুমাত্র চিনকে লক্ষ্য করে অস্ত্র বিক্রি নয়। বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব গড়ে তুলে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয় তৈরির বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।

ব্রহ্মস নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। ২০২২ সালে ফিলিপিন্স প্রায় ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে ব্রহ্মস কিনেছিল। এরপর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে এই ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আলোচনা ও চুক্তি হয়েছে। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডও ভবিষ্যতে এই তালিকায় যুক্ত হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এই দেশগুলির ভৌগোলিক অবস্থানই ভারতের কৌশলকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলছে। দক্ষিণ চিন সাগরের তীরবর্তী একাধিক দেশ দীর্ঘদিন ধরে চিনের সঙ্গে সমুদ্রসীমা ও আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে বিরোধে জড়িত। ফলে ভারত যদি তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে, তা হলে সরাসরি দক্ষিণ চিন সাগরে ভারতীয় বাহিনী মোতায়েন না করেও বেজিংয়ের উপর কৌশলগত চাপ তৈরি করা সম্ভব।

অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল পিআর শংকরের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘ব্রহ্মস বেল্ট’ কোনও আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নয়। বরং চিনের সঙ্গে সমুদ্র-সংক্রান্ত বিরোধে থাকা দেশগুলির সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি নেটওয়ার্ক। অর্থাৎ ভারত নিজের সামরিক উপস্থিতি সরাসরি বাড়ানোর বদলে অংশীদার দেশগুলির প্রতিরক্ষা শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে।

দক্ষিণ চিন সাগরের গুরুত্ব শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিপুল। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ এটি। এই অঞ্চলের সমুদ্রপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালিত হয়। অথচ এই সমুদ্রের প্রায় ৯০ শতাংশের উপর নিজেদের ঐতিহাসিক অধিকার রয়েছে বলে দাবি করে চিন। সেই দাবির বিরোধিতা করে ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্স, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই এবং তাইওয়ান।

গত কয়েক বছরে দক্ষিণ চিন সাগরে চিনের টহল ও সামরিক তৎপরতা নিয়ে একাধিকবার উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে উপকূলীয় দেশগুলির হাতে দীর্ঘপাল্লার ও দ্রুতগামী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলে সমুদ্রসীমা সুরক্ষায় তাদের সক্ষমতা বাড়বে। ব্রহ্মস সেই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন কৌশলগত বিশেষজ্ঞরা।

তবে এই সমীকরণকে সরাসরি ‘চিনকে ঘিরে ফেলা’ বলার বদলে ভারতের বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। প্রতিরক্ষা রফতানি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলির সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা—এই তিনটি ক্ষেত্রকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে ভারত যে আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে চাইছে, ব্রহ্মস তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠছে।

সব মিলিয়ে, দক্ষিণ চিন সাগরে সরাসরি যুদ্ধজাহাজ বা সেনা মোতায়েন না করেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের পথেই হাঁটছে নয়াদিল্লি। ব্রহ্মসকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে এই অংশীদারিত্ব যত বাড়বে, ততই বদলাতে পারে ইন্দো-প্যাসিফিকের কৌশলগত সমীকরণ। আর সেই কারণেই ভারতের এই ‘ব্রহ্মস কূটনীতি’ চিনের জন্য নিঃসন্দেহে নজর রাখার মতো একটি বিষয়।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন