একবেলার খাবারের জন্য ৮ কিমি হাঁটতেন, মাসে পেতেন ৩৫ টাকা! সেই নানাই কীভাবে হয়ে উঠলেন ‘নটসম্রাট’

একবেলার খাবারের জন্য সিনেমার পোস্টার আঁকা থেকে তিন বার জাতীয় পুরস্কার জয়—নানা পাটেকরের জীবন ছিল ক্ষুধা, অপমান, থিয়েটার এবং অভিনয়ের দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নানা পাটেকর (Nana Patekar)-এর জীবনটা শুরু থেকেই তারকার মতো ছিল না। মাত্র ১৩ বছর বয়সে সংসারের আর্থিক দায়িত্ব এসে পড়েছিল তাঁর কাঁধে। স্কুলের পর সিনেমার পোস্টার আঁকার কাজ করতেন, মাসে আয় ছিল মাত্র ৩৫ টাকা। কাজের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ হাঁটতে হত, আর সেই পারিশ্রমিকের সঙ্গে জুটত একবেলার খাবার।

বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬, ৭৫ বছর বয়সে গোয়ার বাড়িতে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হয়েছেন এই অভিনেতা। পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম স্বতন্ত্র মুখ। কিন্তু সেই পরিচিতির পিছনে ছিল দীর্ঘ লড়াই, অভাব এবং খুব অল্প বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা।

নানার আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। মহারাষ্ট্রে জন্ম তাঁর। ছোটবেলায় পরিবারের আর্থিক অবস্থা একেবারে খারাপ ছিল না। তাঁর বাবা ব্যবসা করতেন। কিন্তু পরিবারের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তির সঙ্গে ব্যবসায়িক সমস্যার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। নানার নিজের বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁদের পরিবার মধ্যবিত্ত অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে আর্থিক সংকটে পড়ে।
[নানা পাটেকর কে ছিলেন? ‘ক্রান্তিবীর’ থেকে ‘ওয়েলকাম’, অভিনয়ে কীভাবে তৈরি হয়েছিল আলাদা পরিচয়]
[মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগে গোয়ার মঞ্চে নানা পাটেকর, শেষ প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে কী বলেছিলেন অভিনেতা]

তখন তিনি নবম শ্রেণির ছাত্র। বয়স মাত্র ১৩। পড়াশোনার পাশাপাশি রোজগার শুরু করতে হয় তাঁকে। চুনাভাট্টিতে গিয়ে সিনেমার পোস্টার আঁকতেন। দিনের কাজ শেষে বাড়ি ফেরার আগে সেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হত পায়ে হেঁটে। মাসের শেষে হাতে আসত ৩৫ টাকা। বিনিময়ে মিলত একবেলার খাবারও।

পরবর্তী সময়ে নানা জানিয়েছিলেন, সেই ক্ষুধা আর অপমানই তাঁকে জীবনের অন্য পাঠ শিখিয়েছিল। অভিনয়ের কোনও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের আগে বাস্তব জীবনই তাঁর শিক্ষক হয়ে উঠেছিল। মানুষের কষ্ট, রাগ, অপমান, অসহায়তা—এই অভিজ্ঞতাগুলিই পরে তাঁর অভিনয়ের মধ্যে অন্য মাত্রা যোগ করে।

অভাবের দিনগুলিতে একটা খাবারও তাঁর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা নানা একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন। গরম রুটির গন্ধ তাঁর কাছে তখন ছিল বিশেষ কিছু। কারণ ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাবারের মূল্য কী, সেটা তিনি খুব কাছ থেকে চিনেছিলেন।

অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ অবশ্য আরও আগে থেকেই ছিল। তাঁর বাবা তাঁকে নাটকের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিলেন। থিয়েটারের মঞ্চে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে তাঁর ভিত তৈরি করে। পরে জে জে স্কুল অফ আর্টে পড়াশোনাও করেন তিনি। কিন্তু তাঁর শিল্পীসত্তার বড় অংশ তৈরি হয়েছিল মঞ্চ এবং জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।

সিনেমায় তাঁর পথচলা শুরু ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ দিয়ে। প্রথম থেকেই বড় তারকার চরিত্র বা নায়কোচিত সুযোগ পাননি। ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করে নিজের জায়গা তৈরি করতে হয়েছে। ১৯৮৬ সালের ‘অঙ্কুশ’ তাঁকে দর্শকের নজরে আনে। পরে ‘সালাম বম্বে!’-র মতো ছবিতে কাজ করে পরিচালকদের কাছেও নিজের অভিনয়ের ক্ষমতা স্পষ্ট করে দেন।

তারপর আসে ‘পরিন্দা’। ১৯৮৯ সালে এই ছবির জন্য সেরা সহ-অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান নানা। এরপর ‘ক্রান্তিবীর’-এর জন্য ১৯৯৪ সালে সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার এবং ‘অগ্নিসাক্ষী’-র জন্য ১৯৯৬ সালে ফের সেরা সহ-অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার পান। অর্থাৎ অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার তাঁর ঝুলিতে আসে তিন বার।

তবে নানাকে শুধু গম্ভীর চরিত্রের অভিনেতা বললে তাঁর অভিনয়জীবনের একটা বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। ‘প্রহার’, ‘খামোশি’, ‘আব তক ছাপ্পন’, ‘আপহরণ’-এর মতো ছবিতে কখনও কঠোর, কখনও জটিল চরিত্রে তাঁকে দেখা গিয়েছে। আবার ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেট্টি চরিত্রে তাঁর কমিক অভিনয়ও আলাদা করে দর্শকের মনে জায়গা করে নেয়।

হিন্দি সিনেমার পাশাপাশি মারাঠি ছবিতেও তাঁর দাপট ছিল। ২০১৬ সালের ‘নটসম্রাট’ তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নাট্যজগতের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক থাকা এক অভিনেতার কাছে মঞ্চের কিংবদন্তি চরিত্র গণপত বেলওয়ালকরকে পর্দায় তুলে ধরা ছিল বিশেষ তাৎপর্যের।

নানা শুধু অভিনেতা ছিলেন না। ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ ছবির পরিচালনাও করেছিলেন। পাশাপাশি থিয়েটারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন এবং পরবর্তী জীবনেও অভিনয় চালিয়ে গিয়েছেন। শিল্পে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে।

তাঁর অভিনয়ের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল—চরিত্রকে শুধু সংলাপের মধ্যে আটকে না রেখে তার ভিতরের টানাপড়েনকে সামনে নিয়ে আসা। রাগ, ভয়, যন্ত্রণা কিংবা বিদ্রোহ—সবকিছুকেই নিজের অভিনয়ের ভাষায় প্রকাশ করতে পারতেন তিনি। সম্ভবত সেই কারণেই পর্দায় নানার উপস্থিতি অনেক সময় তাঁর সংলাপের থেকেও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠত।

আজ যখন তাঁর জীবনের দিকে ফিরে তাকানো হচ্ছে, তখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসছে সেই ১৩ বছরের ছেলেটির গল্প। যে বয়সে অনেকের জীবনে ভবিষ্যতের স্বপ্ন তৈরি হয়, সেই বয়সেই নানা পাটেকরকে পরিবারের জন্য রোজগার করতে হয়েছিল। ৩৫ টাকার সেই কাজ, পোস্টারের রং, দীর্ঘ পথ হাঁটা এবং একবেলার খাবারের লড়াই—সবই থেকে গিয়েছিল তাঁর স্মৃতিতে।

সেই ছেলেটিই পরে তিন বার জাতীয় পুরস্কার জিতেছেন, পদ্মশ্রী পেয়েছেন, অসংখ্য মনে রাখার মতো চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ‘ক্রান্তিবীর’-এর তীব্রতা থেকে ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেট্টি, আবার ‘নটসম্রাট’-এর গণপত বেলওয়ালকর—প্রতিটি চরিত্রে তিনি নিজের আলাদা ছাপ রেখে গিয়েছেন।

তাই নানা পাটেকরের জীবনকে শুধু ৩৫ টাকা থেকে তারকা হয়ে ওঠার গল্প বললে হয়তো তাঁর লড়াইটাকে ছোট করা হবে। তাঁর গল্প আসলে এমন এক কিশোরের, যে অভাবের মধ্যে কাজ করতে করতে মানুষের জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখেছিল—আর বহু বছর পরে সেই দেখা জীবনকেই অভিনয়ের ভাষায় পর্দায় ফিরিয়ে দিয়েছিল।

একদিন যে হাতে সিনেমার পোস্টারের রং লেগেছিল, সেই হাতই পরে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে একের পর এক স্মরণীয় চরিত্র এঁকে দিয়েছে। আর সেই দীর্ঘ যাত্রার শেষ প্রান্তে এসে নানা পাটেকর শুধু একজন সফল অভিনেতা নন—নিজের জীবনকেই অভিনয়ের সবচেয়ে বড় স্কুল বানিয়ে ফেলা এক শিল্পী।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন