নানা পাটেকর কে ছিলেন? ‘ক্রান্তিবীর’ থেকে ‘ওয়েলকাম’, অভিনয়ে কীভাবে তৈরি হয়েছিল আলাদা পরিচয়

থিয়েটার থেকে বড় পর্দা, ‘পরিন্দা’ ও ‘ক্রান্তিবীর’-এর জাতীয় পুরস্কারজয়ী অভিনয় থেকে ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেট্টি—নানা পাটেকরের প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়যাত্রা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নানা পাটেকর শুধু বলিউডের একজন অভিনেতা ছিলেন না, তাঁর অভিনয়ের নিজস্ব ভাষাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল। তীব্র সংলাপ, সংযত শরীরী অভিব্যক্তি এবং চরিত্রের ভিতরে ঢুকে যাওয়ার ক্ষমতা—এই তিনের মিশেলে প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে তৈরি করেছিলেন নিজের আলাদা জায়গা। ৭৫ বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণের পর তাই ফিরে দেখা জরুরি, কীভাবে মঞ্চ থেকে শুরু করে ‘ক্রান্তিবীর’, ‘পরিন্দা’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘নটসম্রাট’ এবং ‘ওয়েলকাম’-এর মতো ছবিতে নিজের ছাপ রেখে গিয়েছিলেন তিনি।

১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে জন্ম বিশ্বনাথ পাটেকরের। পরবর্তী সময়ে ‘নানা পাটেকর’ নামেই পরিচিত হন তিনি। অভিনয়ের শুরুটা হয়েছিল থিয়েটার দিয়ে। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় পা রাখেন। প্রথম দিকে ছোট ও পার্শ্বচরিত্রে কাজ করলেও তাঁর অভিনয়ের স্বতন্ত্র ধরন ধীরে ধীরে নজর কাড়তে শুরু করে।

তাঁর কেরিয়ারে বড় মোড় আসে ১৯৮০-র দশকের শেষ দিকে। মীরা নায়ারের ‘সালাম বম্বে!’-তে অভিনয়ের পর আরও বড় পরিসরে পরিচিতি পান তিনি। এরপর ১৯৮৯ সালের ‘পরিন্দা’ ছবিতে অপরাধজগতের চরিত্রে তাঁর অভিনয় সমালোচক মহলে বিশেষ প্রশংসা পায়। এই ছবির জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান নানা পাটেকর। একই ছবির জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও আসে তাঁর ঝুলিতে। [গোয়ায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত নানা পাটেকর, ৭৫-এ থামল কিংবদন্তি অভিনেতার পথচলা]

এরপর আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘অঙ্গার’, ‘তিরঙ্গা’, ‘রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান’-এর মতো ছবিতে কখনও কঠিন, কখনও নেতিবাচক, কখনও আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। ১৯৯৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ক্রান্তিবীর’ তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম মাইলফলক হয়ে ওঠে। প্রাতাপ নারায়ণ তিলক চরিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেতার সম্মান পান তিনি। [মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগে গোয়ার মঞ্চে নানা পাটেকর, শেষ প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে কী বলেছিলেন অভিনেতা]

‘ক্রান্তিবীর’-এ নানা পাটেকরের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর সংলাপ বলার ধরন। চিৎকার না করেও কীভাবে একটি চরিত্রের রাগ, হতাশা, প্রতিবাদ কিংবা আবেগ দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেই ক্ষমতা তাঁর অভিনয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। মৃত্যুর পরেও ছবিটির একটি বিখ্যাত মনোলগ নতুন করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে, যা তাঁর অভিনয়ের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবেরই ইঙ্গিত দেয়।

১৯৯০-এর দশকেও নানা পাটেকরের ঝুলিতে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আসে। ‘অগ্নিসাক্ষী’-তে অভিনয়ের জন্য তিনি দ্বিতীয় বার সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’-এও তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। পরবর্তী সময়ে ‘শক্তি: দ্য পাওয়ার’, ‘আব তক ছাপ্পন’, ‘অপহরণ’ এবং ‘রাজনীতি’-র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় ফের প্রমাণ করে, একই অভিনেতা কতটা ভিন্ন ধরনের চরিত্র বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারেন।

তবে নানা পাটেকরকে শুধু গম্ভীর বা তীব্র চরিত্রের অভিনেতা ভাবলে তাঁর অভিনয়জীবনের একটা বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। ২০০৭ সালের ‘ওয়েলকাম’ ছবিতে উদয় শেট্টির চরিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে সম্পূর্ণ নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়। একজন ভয়ংকর গ্যাংস্টারের চরিত্রকে একই সঙ্গে হাস্যরসাত্মক ও স্মরণীয় করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অভিনয় ছিল ছবিটির অন্যতম আকর্ষণ। পরে ‘ওয়েলকাম ব্যাক’-এও একই চরিত্রে ফিরেছিলেন তিনি।

হিন্দি ছবির পাশাপাশি মারাঠি সিনেমাতেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০১৬ সালের ‘নটসম্রাট’-এ অবসরপ্রাপ্ত এক মঞ্চ অভিনেতার চরিত্রে অভিনয় করে ফের ব্যাপক প্রশংসা পান তিনি। এই ছবির জন্য ফিল্মফেয়ার মারাঠি সেরা অভিনেতার পুরস্কারও পান। অর্থাৎ, জীবনের শুরুতে যে থিয়েটার তাঁকে অভিনয়ের ভিত তৈরি করে দিয়েছিল, ‘নটসম্রাট’-এর মতো ছবিতে এসে সেই মঞ্চের অভিজ্ঞতাই যেন অন্য মাত্রায় ফিরে আসে।

অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনাতেও হাতেখড়ি হয়েছিল তাঁর। ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ ছিল তাঁর পরিচালিত ছবি। সিনেমাটিতে সেনাজীবন ও কঠোর প্রশিক্ষণের প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে কাজ করেছিলেন তিনি। পরিচালক হিসেবে তাঁর কাজের তালিকা অভিনয়ের তুলনায় ছোট হলেও, এই দিকটিও তাঁর বহুমুখী শিল্পীসত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দীর্ঘ কেরিয়ারে নানা পাটেকর মোট তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন—‘পরিন্দা’-র জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতা, ‘ক্রান্তিবীর’-এর জন্য সেরা অভিনেতা এবং ‘অগ্নিসাক্ষী’-র জন্য ফের সেরা পার্শ্ব অভিনেতা। এছাড়া চারটি ফিল্মফেয়ার এবং দুটি ফিল্মফেয়ার মারাঠি পুরস্কারও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে।

নানা পাটেকরের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি চরিত্রকে শুধু সংলাপের মধ্যে আটকে রাখতেন না। চোখের দৃষ্টি, গলার স্বর, থেমে থেমে কথা বলা কিংবা আচমকা স্বরের তীব্রতা বাড়িয়ে দেওয়া—সবকিছুকেই অভিনয়ের অংশ করে তুলেছিলেন। তাই ‘ক্রান্তিবীর’-এর প্রতিবাদী নায়ক, ‘পরিন্দা’-র অন্ধকার জগতের মানুষ কিংবা ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেট্টি—তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা চরিত্র হলেও পর্দায় প্রত্যেকটির আলাদা অস্তিত্ব তৈরি হয়েছিল।

প্রায় পাঁচ দশকের সেই যাত্রায় নানা পাটেকর একই ধরনের ভূমিকায় নিজেকে আটকে রাখেননি। মঞ্চ, হিন্দি সিনেমা, মারাঠি সিনেমা, পরিচালনা—বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন। তাঁর অভিনয়জীবনের এই বৈচিত্র্যই তাঁকে শুধু জনপ্রিয় অভিনেতা নয়, ভারতীয় সিনেমার অন্যতম স্বতন্ত্র পারফর্মার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল।

নানা পাটেকরের প্রয়াণে সেই কারণেই শুধু একজন জনপ্রিয় তারকার মৃত্যু হল না; ভারতীয় সিনেমা হারাল এমন এক অভিনেতাকে, যাঁর অভিনয়কে আলাদা করে চিনতে কোনও ছবির নাম বলারও প্রয়োজন হত না—কণ্ঠস্বর, সংলাপ বলার ধরন এবং পর্দায় উপস্থিতিই যথেষ্ট ছিল।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন