আইএফএ শিল্ডের ফাইনালে কলকাতা ডার্বি জমে উঠেছে। ৮৩ মিনিটের খেলা শেষে ১-০ গোলে এগিয়ে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে সাহালের ক্রস থেকে বুক দিয়ে বল নিয়ন্ত্রণ করে গোল করেন সামির জেলকোভিচ। তার পর থেকে গোল শোধের মরিয়া চেষ্টা করেও তেমন কোনও পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারেনি ইস্টবেঙ্গল। উল্টে ৬৭ মিনিটে লুকাস জিয়োলিনস্কির হেড দুরন্ত সেভে আটকে দিয়ে মোহনবাগানকে বাঁচান গোলরক্ষক বিশাল কাইথ।
ম্যাচের শুরুতে অবশ্য ইস্টবেঙ্গলই ছিল বেশি সক্রিয়। বাঁ দিক দিয়ে বার বার আক্রমণে উঠছিল লাল-হলুদ। ৬ মিনিটেই গোল করার সবচেয়ে সহজ সুযোগ পেয়েছিলেন এডমুন্ড লালরিনডিকা। একেবারে একা বিশালকে পেয়েও ঠিক জায়গায় বল রাখতে পারেননি তিনি। বিশালের সেভে বেঁচে যায় মোহনবাগান।
[জয়ী মোহনবাগান – বিস্তারিত এখানে]
৯ মিনিটের পরও ইস্টবেঙ্গলের পাসিং ছিল বেশ গুছানো। মোহনবাগানের অর্ধে একের পর এক পাস খেলছিল তারা। বিপিন সিংহও বক্সের বাইরে থেকে শট নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সেই সময় বলের নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সমস্যায় পড়েছিল সবুজ-মেরুন।
ধীরে ধীরে অবশ্য ম্যাচে ফিরতে শুরু করে মোহনবাগান। ১৫ মিনিটে কয়েক জন ইস্টবেঙ্গল ফুটবলারকে কাটিয়ে শট নিয়েছিলেন লি আরউইন। কিন্তু শটটি দুর্বল হওয়ায় সহজেই ধরে ফেলেন ফুর্বা লাচেনপা।
১৮ মিনিটে বাঁ দিক দিয়ে একাই ইস্টবেঙ্গলের বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন লালিয়ানজুয়ালা ছাংতে। তবে সতীর্থকে পাস না দিয়ে নিজেই শট নিতে গিয়ে রক্ষণে আটকে যান তিনি। কয়েক মিনিট পর আরও বড় সুযোগ পায় মোহনবাগান।
২৩ মিনিটে বাঁ প্রান্ত থেকে অভিষেকের ভাসানো ক্রসে ফাঁকায় হেড করেছিলেন মেহতাব। তাঁকে মার্ক করেননি ইস্টবেঙ্গলের কোনও ডিফেন্ডার। কিন্তু সেই সুযোগও কাজে লাগাতে পারেননি মেহতাব। তাঁর হেড লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
ম্যাচের ৩৩ মিনিটের পর থেকে মোহনবাগানের আক্রমণের গতি আরও বাড়ে। ইস্টবেঙ্গল প্রথম দিকে যতটা সংগঠিত ছিল, ধীরে ধীরে সেই ছন্দ কিছুটা হারাতে থাকে। ৩৬ মিনিটে দূরপাল্লার শটে লাচেনপার পরীক্ষা নেন ছাংতে। ফিস্ট করে বল বাইরে পাঠান ইস্টবেঙ্গলের গোলরক্ষক। পরের আক্রমণে সাহালের শটও বাঁচান তিনি।
কিন্তু প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ৪৫ মিনিটে জেলকোভিচের পা থেকেই আক্রমণ শুরু হয়। তাঁর পাস যায় আরউইনের কাছে। আরউইন বল বাড়ান সাহালকে। বাঁ দিক থেকে সাহালের ভাসানো ক্রস বুকে নিয়ন্ত্রণ করে জালে পাঠান জেলকোভিচ। তাঁকে মার্কিংয়ে রাখতে পারেনি ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণ। ১-০ এগিয়ে যায় মোহনবাগান।
বিরতিতে তাই পিছিয়ে থেকেই মাঠ ছাড়ে ইস্টবেঙ্গল। প্রথমার্ধের একটা বড় সময় ভাল খেলেও সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি তারা। অন্য দিকে মোহনবাগান যতগুলি পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করেছিল, তার মধ্যে অন্তত দু’টি থেকে গোল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। লাচেনপার বেশ কয়েকটি সেভে তখনও ম্যাচে ছিল ইস্টবেঙ্গল।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও মোহনবাগান গোল বাড়ানোর চেষ্টা করে। ৪৮ মিনিটে ক্রস ধরতে গিয়ে লাচেনপার সঙ্গে ধাক্কা লাগে সাহালের। তবে গোলের সুযোগ তৈরি হয়নি।
৫৩ মিনিটের পর থেকে ম্যাচ আরও শারীরিক হয়ে ওঠে। একাধিক ফাউল হয়। ৫৪ মিনিটে হেড করতে গিয়ে দ্রাজিচের সঙ্গে মান্ডির সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে দু’দলের ফুটবলারদের মধ্যে হাতাহাতিও শুরু হয়। দ্রাজিচের মাথা থেকে রক্ত বেরোতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ চিকিৎসার পর ফের খেলা শুরু হয়।
গোলের সন্ধানে ৫৮ মিনিটে জোড়া বদল করেন ইস্টবেঙ্গল কোচ আন্তোনিয়ো লোপেজ় হাবাস। পিভি বিষ্ণু এবং আকে লোবাকে মাঠে নামানো হয়। বিরতির পর লুকাস জিয়োলিনস্কিকেও মাঠে নামানো হয়েছিল।
কিন্তু বদল করেও ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণে সেই ধার দেখা যায়নি। ৬৫ মিনিটের পর থেকে লাল-হলুদের পাসিংয়ে একাধিক ভুল হচ্ছিল। এক গোলে পিছিয়ে থাকার পরও ভাল মুভ তৈরি করতে পারছিল না তারা। লোবা বল পেলেও বার বার মাটিতে পড়ছিলেন। ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণে জিয়োলিনস্কির একটি হেডই তখন পর্যন্ত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সুযোগ।
৬৭ মিনিটে অবশ্য সমতা ফেরানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ আসে ইস্টবেঙ্গলের সামনে। ডান দিক থেকে নুঙ্গার বাড়ানো ক্রসে মাথা ছোঁয়ান জিয়োলিনস্কি। বল প্রায় গোলের দিকে চলে গিয়েছিল। কিন্তু ডান দিকে ঝাঁপিয়ে দুরন্ত সেভ করেন বিশাল কাইথ। সেই সেভেই তখনও ১-০ ব্যবধান ধরে রাখে মোহনবাগান। পরের আক্রমণে ছাংতের শট অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়।
৭৫ মিনিটে জলপানের বিরতির সময়ও ম্যাচের চিত্র খুব একটা বদলায়নি। দুই দলের খেলাতেই গতি কমে যায়। বিশেষ করে ইস্টবেঙ্গলের কাছে গোলের প্রয়োজন থাকলেও আক্রমণ তৈরির ক্ষেত্রে তেমন তৎপরতা দেখা যাচ্ছিল না।
৮৩ মিনিটে এসে ইস্টবেঙ্গলের জন্য সময় আরও কমে গিয়েছে। গোল শোধ করার মতো কোনও পরিষ্কার মুভ এখনও তৈরি করতে পারেনি লাল-হলুদ। বক্সের বাইরে ফ্রিকিক পেলেও রশিদের শট সরাসরি দেওয়ালে আটকে যায়। লোবা বল পেলেই প্রতিপক্ষের চাপে পড়ছেন। জিয়োলিনস্কির সেই হেড ছাড়া দ্বিতীয়ার্ধে এখনও পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি ইস্টবেঙ্গল।
অন্য দিকে মোহনবাগানও খুব বেশি ঝুঁকি নিচ্ছে না। এক গোলের ব্যবধান ধরে রেখে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখাই এখন তাদের লক্ষ্য। বলের দখলেও ইস্টবেঙ্গলের তুলনায় কিছুটা এগিয়ে সবুজ-মেরুন। তবে তাদের খেলাতেও গতি কমেছে।
ম্যাচের আর কয়েক মিনিট। ডুরান্ড কাপ ফাইনালে ৪-১ হারের পর এই আইএফএ শিল্ড ফাইনালকে বদলার মঞ্চ হিসেবেই দেখছে মোহনবাগান। অন্য দিকে ডুরান্ডের সেই জয়ের পর আরও একটি ট্রফি ঘরে তোলার সুযোগ ছিল ইস্টবেঙ্গলের সামনে। এখন সেই স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে হলে দ্রুত জাল খুঁজে নিতে হবে লাল-হলুদকে।
৮৩ মিনিটের আপডেট: মোহনবাগান ১-০ ইস্টবেঙ্গল। গোলদাতা—সামির জেলকোভিচ (৪৫’)।



