১০ লক্ষ টাকার পুরস্কার ঘোষিত মাওবাদী নেত্রীর আত্মসমর্পণ, লালবাজারে বড় সাফল্য

বেলপাহাড়ির মেয়ে শকুন্তলা মাহাতো ওরফে পুষ্পা, যার মাথার দাম ছিল ১০ লক্ষ টাকা, তিনি লালবাজারে আত্মসমর্পণ করলেন। নিরাপত্তা মহলে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে ঘটনাকে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা বাহিনীর নজরে থাকা এক শীর্ষ মাওবাদী নেত্রী অবশেষে মূলস্রোতে ফেরার পথ বেছে নিলেন। পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলমহল থেকে ঝাড়খণ্ডের ঘন জঙ্গল— দীর্ঘ সশস্ত্র আন্দোলনের ইতিহাস পেরিয়ে বুধবার কলকাতার লালবাজারে আত্মসমর্পণ করলেন সিপিআই (মাওবাদী)-র জোনাল কমিটির সদস্য শকুন্তলা মাহাতো ওরফে পুষ্পা। তাঁর মাথার দাম ছিল ১০ লক্ষ টাকা।

কলকাতা পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, আত্মসমর্পণের সময় তাঁর কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মাওবাদী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করা এই নেত্রীর আত্মসমর্পণকে নিরাপত্তা সংস্থাগুলির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

১০ বছর বয়সে মাওবাদী শিবিরে যোগ

শকুন্তলা মাহাতোর বাড়ি ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ি এলাকার মেছুয়া গ্রামে। পরিবার ও পরিচিতদের কাছে তিনি ‘লুটুন’ নামেই পরিচিত ছিলেন। খুব অল্প বয়সেই পড়াশোনার গণ্ডি ছেড়ে মাওবাদী আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হন। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর তিনি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন।

প্রথমদিকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সংগঠনের সঙ্গে কাজ শুরু করলেও পরে ধীরে ধীরে সশস্ত্র স্কোয়াডের অংশ হয়ে ওঠেন। সংগঠনের মধ্যে তিনি পুষ্পা, বর্ষা, পরি-সহ একাধিক নামে পরিচিত ছিলেন।

জঙ্গলমহল থেকে সারান্ডা

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন মাওবাদী ঘাঁটিতে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন শকুন্তলা। বেলপাহাড়ি, দলমা, ঘাটশিলা, পারশনাথ, তামাড় এবং সারান্ডা জঙ্গল এলাকায় তাঁর সক্রিয় ভূমিকার কথা তদন্তকারী সংস্থার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

মাওবাদী আন্দোলনের উত্থানপর্বে জঙ্গলমহলের বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও তিনি যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান জোরদার হওয়ায় সংগঠনের একাংশ ঝাড়খণ্ডে সরে যায় এবং সেখান থেকেই কার্যক্রম পরিচালনা করত।

আত্মসমর্পণের বার্তা

আত্মসমর্পণের পর শকুন্তলা মাহাতো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য সদস্যদেরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘ সংঘাত ও সহিংসতার পথ ছেড়ে উন্নয়ন ও মূলধারার সমাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়াই ভবিষ্যতের জন্য ভালো।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে মাওবাদী সংগঠনের উপর ধারাবাহিক চাপ, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান এবং সংগঠনের ভিতরে সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে বহু নেতা-কর্মী আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিচ্ছেন।

জঙ্গলমহলে নতুন বার্তা

এক সময় যাঁর নাম নিরাপত্তা বাহিনীর ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় ছিল, সেই শকুন্তলা মাহাতোর আত্মসমর্পণ জঙ্গলমহলের পরিবর্তিত বাস্তবতারই প্রতিফলন বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল। দীর্ঘদিনের সশস্ত্র আন্দোলনের পথ ছেড়ে তাঁর মূলধারায় ফেরার সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আরও অনেক সক্রিয় সদস্যকে একই পথে হাঁটতে উৎসাহিত করতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।

জঙ্গলের অন্ধকার অধ্যায় পেরিয়ে এবার নতুন জীবনের পথে হাঁটতে চলেছেন একসময়ের শীর্ষ মাওবাদী নেত্রী। আর সেই কারণেই এই আত্মসমর্পণ শুধুমাত্র একটি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা নয়, বরং জঙ্গলমহলের বদলে যাওয়া সময়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

বিজ্ঞাপন

আরও খবর