দীর্ঘ চার দশকের জঙ্গিজীবনের অবসান? পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরে সিপিআই (মাওবাদী)-র শীর্ষনেতা অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশ ওরফে মনোজকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে খবর। কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF) তাঁকে পাকড়াও করেছে বলে সূত্রের দাবি। চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যেই তিনি পটাশপুর এলাকায় এসেছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে।
অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশ দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তাবাহিনীর নজরে ছিলেন। ঝাড়খণ্ড পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে সিপিআই (মাওবাদী)-র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং তাঁর সন্ধান দিতে ১ কোটি টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। অগস্টের শেষেও তিনি নিরাপত্তাবাহিনীর নাগালের বাইরে ছিলেন বলে সরকারি সূত্রে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়।
সম্প্রতি বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমান্তবর্তী জঙ্গল এলাকায় তাঁকে খুঁজতে নিরাপত্তাবাহিনীর তল্লাশি জোরদার হয়েছিল। সেই অভিযানে রোলাহাটু পাহাড় এলাকা থেকে ইনসাস রাইফেল, গুলি এবং ম্যাগাজিন উদ্ধারের খবর সামনে আসে। তবে ওই অস্ত্রের সঙ্গে আকাশের সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, তা তদন্তের বিষয়।
দীর্ঘদিন জঙ্গলে আত্মগোপন করে থাকার কারণে আকাশের গতিবিধি সম্পর্কে নিরাপত্তাবাহিনী নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করছিল। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কয়েক জন আত্মসমর্পণ বা গ্রেফতার হওয়ায় সংগঠনের পুরনো নেটওয়ার্ক সম্পর্কেও তদন্তকারীরা তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন।
আকাশের মাওবাদী জীবনের সূত্রপাতও বহু পুরনো। বিভিন্ন নিরাপত্তা ও সংবাদ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কলেজজীবন থেকেই তিনি বামপন্থী উগ্রপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে সিপিআই (মাওবাদী)-র সাংগঠনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেন। পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলাঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠনের কার্যকলাপের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়েছে।
কিষানজির মৃত্যুর পর পশ্চিমবঙ্গের মাওবাদী সংগঠনে আকাশের গুরুত্ব আরও বেড়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গলেই থাকার কারণে তাঁকে গ্রেফতার করা নিরাপত্তাবাহিনীর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে পটাশপুরের মতো তুলনামূলক জনবসতিপূর্ণ এলাকায় তাঁর উপস্থিতির খবর তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কীভাবে তিনি সেখানে পৌঁছেছিলেন, কারা তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিল এবং তাঁর সঙ্গে আর কারও যোগাযোগ ছিল কি না—গ্রেফতারের পর এই বিষয়গুলিই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
তাঁর চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল কি না এবং চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যেই তিনি পটাশপুরে এসেছিলেন কি না, সেই দাবিও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। পাশাপাশি এতদিন ধরে জঙ্গলভিত্তিক সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ১৭ সেপ্টেম্বর গ্রেফতারের খবর সামনে এলেও প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে এখনও এই গ্রেফতারির বিস্তারিত সরকারি বিবৃতি বা আদালত-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে আকাশকে ঠিক কোথা থেকে, কীভাবে এবং কোন মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে—সেই বিষয়ে আরও সরকারি তথ্যের অপেক্ষা রয়েছে।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিরাপত্তাবাহিনীর নজরে থাকা এক শীর্ষ মাওবাদী নেতাকে সত্যিই পটাশপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়ে থাকলে, তাঁর জিজ্ঞাসাবাদে পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের মাওবাদী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে। এখন তদন্তকারীদের নজর সেই দিকেই।



