‘ভ্যানিশ কুমারকে ধরেছি, কেউ পার পাবে না’, শ্রীরামপুরের সভা থেকে জ্ঞানেশকে হুঁশিয়ারি মমতার

শ্রীরামপুরের সভা থেকে জ্ঞানেশ কুমারকে ফের নিশানা মমতার। SIR-এ ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ, সীমা খান্নার ভূমিকা এবং নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য নিয়েও সরব তৃণমূল নেত্রী।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

শ্রীরামপুরের সভা থেকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ফের নিশানা করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। SIR এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব তৃণমূল নেত্রী শনিবারের সভা থেকে আরও একবার তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করলেন। জ্ঞানেশ কুমারকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘ভ্যানিশ কুমারকে যেমন ধরেছি, তেমন অন্যায়কারীদের ধরব।’ তাঁর বক্তব্য, জ্ঞানেশ কুমার পদে থাকা পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন চলবে।

SIR নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের খবর প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। আপত্তির মধ্যে ভোটারদের নাম যোগ-বিয়োগ, ফর্ম ৬ এবং ভোটার-তথ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ও ছিল।

তবে নির্বাচন কমিশন ওই প্রতিবেদনের ব্যাখ্যায় জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ নোট, মতামত বা পর্যবেক্ষণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ। কমিশনের দাবি, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে।

‘ভ্যানিশ কুমার মাস্ট গো’

শনিবার শ্রীরামপুরের কোর্ট ময়দানে সভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ভ্যানিশ কুমারকে যেমন ধরেছি, তেমন অন্যায়কারীদের ধরব। ভ্যানিশ কুমার মাস্ট গো। যতদিন না যাবে, আমাদের আন্দোলন চলবে।’’

জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে আক্রমণ করার পাশাপাশি SIR নিয়েও নিজের পুরনো অভিযোগের কথা তুলে ধরেন মমতা। তাঁর দাবি, ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং তৃণমূল প্রথম থেকেই এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।

মমতার বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলায় SIR-এর মাধ্যমে প্রায় ৯২ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। এই সংখ্যা নিয়ে অবশ্য রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন রিপোর্টে বাংলার SIR-এ বাদ পড়া নামের হিসাব এবং বাদ দেওয়ার কারণ নিয়ে আলাদা পরিসংখ্যান ও ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।

সীমা খান্নার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

মমতার বক্তব্যে উঠে আসে নির্বাচন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খান্নার নামও। SIR-এর সময় ভোটার-তথ্য পরিচালনা এবং সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা নিয়ে তৃণমূলের তরফে আগেও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।

সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ আপত্তির প্রসঙ্গেও সীমা খান্নার দায়িত্বের বিষয়টি উঠে এসেছে। ইন্ডিয়া টুডে-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ERO-দের ভোটার-তথ্য সংক্রান্ত অ্যাক্সেস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। তৃণমূলের সাংসদ মহুয়া মৈত্রও এই বিষয়ে অভিযোগ করেছিলেন। তবে এসব অভিযোগকে নির্বাচন কমিশন সমর্থন করেনি; কমিশন ECINet-সহ নিজেদের তথ্যপ্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকার কথা জানিয়েছে।

‘৯৩ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দিয়েছে’

শ্রীরামপুরের সভায় মমতা বলেন, ‘‘বাংলা দখল করবে বলে এসআইআর করেছিল, ৯৩ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দিয়েছে। আমরাই প্রথম বলেছিলাম, ওই অফিসার সীমা খান্নার ভূমিকা সন্দেহজনক।’’

এরপর তিনি ভোটার তালিকায় নতুন নাম সংযোজনের জন্য ব্যবহৃত ফর্ম ৬ নিয়েও অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, ‘‘ফর্ম ৬ বস্তায় করে বিজেপির সিল লাগিয়ে জমা দিচ্ছিল বিজেপির লোকজন। সব তথ্য রেখে দিয়েছি।’’

এই বক্তব্যগুলি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলির সবকটি স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।

SIR নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক সংঘাত

SIR নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের খবর প্রকাশ্যে আসার পর বিরোধী দলগুলি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আরও সরব হয়েছে। কংগ্রেস-সহ একাধিক বিরোধী দল নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এর আগে জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবি জানিয়েছিলেন।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট করেছে, সদস্যদের মধ্যে মতামত বা পর্যবেক্ষণের পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে বলে তাদের বক্তব্য।

ফলে SIR-কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক এখন শুধু ভোটার তালিকা সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, ভোটার-তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়েও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।

‘ওরা বাংলা দখল করেছে, আমরা দিল্লি দখল করব’

শ্রীরামপুরের সভা থেকে মমতা আরও বলেন, ‘‘ভ্যানিশ কুমার নামটা আমি প্রথম বলেছিলাম। কারণ ধরে ধরে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে দিচ্ছিল।’’

এরপর রাজনৈতিক বার্তা দিয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘‘ওরা বাংলা দখল করেছে, আমরা দিল্লি দখল করব।’’

মমতার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে SIR ইস্যুকে সামনে রেখে তৃণমূলের রাজনৈতিক আন্দোলন আরও জোরদার করার বার্তা মিলেছে। একই সঙ্গে জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিরোধীদের আক্রমণও আরও তীব্র হয়েছে।

তবে SIR নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য এবং বিরোধীদের অভিযোগ—দুই পক্ষের অবস্থানই আলাদা। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে এই বিতর্ক আগামী দিনেও রাজনৈতিক ও আইনি পরিসরে চলবে বলেই পরিস্থিতি ইঙ্গিত করছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন