কলকাতার টালা এলাকার এক কিশোরীকে দীর্ঘদিন যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার ও দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন সৎ বাবা। অভিযোগ ছিল, সেই নির্যাতনের জেরেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছিল নাবালিকা। কিন্তু মামলার সাত বছর পর গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণের অভাবের কথা উল্লেখ করে অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস দিল কলকাতা হাই কোর্ট। আদালতের এই রায় ঘিরে নতুন করে আলোচনায় পকসো আইনের এই বহুচর্চিত মামলা।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর। আচমকাই তীব্র পেটব্যথায় অসুস্থ হয়ে পড়ে কিশোরী। পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকদের পরীক্ষায় জানা যায়, সে প্রায় তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তবে এটি ছিল ‘একটোপিক প্রেগন্যান্সি’। ভ্রূণ জরায়ুর বাইরে অবস্থান করায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গর্ভপাত করাতে হয়। পরে কয়েকদিন আইসিইউতেও ভর্তি থাকতে হয়েছিল তাকে।
হাসপাতালে চিকিৎসার সময় কিশোরী অভিযোগ করে, তার সৎ বাবা দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে জোর করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতেন। প্রতিবাদ করলে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করে সে। সেই ভয়েই এতদিন কাউকে কিছু জানাতে পারেনি বলেও জানায় নির্যাতিতা।
মেয়ের কাছ থেকে পুরো ঘটনা শোনার পর টালা থানায় অভিযোগ দায়ের করেন তার মা। অভিযোগের ভিত্তিতে পকসো আইনের ৪ এবং ৬ নম্বর ধারায় মামলা রুজু করে পুলিশ। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে গোপন জবানবন্দিতেও একই অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করে কিশোরী এবং আদালতে অভিযুক্তকে শনাক্তও করে।
মামলার শুনানিতে চিকিৎসকরাও জানান, কিশোরীর শরীরে যৌন সম্পর্কের চিহ্ন এবং গর্ভধারণের প্রমাণ মিলেছিল। অস্ত্রোপচারের দাগও ছিল। যদিও শুরু থেকেই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন অভিযুক্ত। তবুও ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি নিম্ন আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা ঘোষণা করে।
পরবর্তীতে সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাই কোর্টে আবেদন করেন অভিযুক্ত। বিচারপতি রাজাশেখর মান্থা এবং বিচারপতি স্মিতা দাস দে-র ডিভিশন বেঞ্চ মামলার সমস্ত নথি ও সাক্ষ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে জানায়, নির্যাতিতা অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিলেন, সেই বিষয়টি নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু ওই গর্ভধারণের জন্য অভিযুক্ত সৎ বাবাই দায়ী—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আদালতের সামনে উপস্থাপিত হয়নি।
এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই নিম্ন আদালতের দোষী সাব্যস্ত করার রায় বাতিল করে অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস দেয় কলকাতা হাই কোর্ট। দীর্ঘ সাত বছর ধরে চলা এই মামলার পর আদালতের রায় ফের একবার ফৌজদারি মামলায় শক্তিশালী প্রমাণের গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে।



