চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে মৃত বেড়ে ১৯, নিহতদের তালিকায় ৭ বছরের শিশুও, আহত ২৫

বৃষ্টির মধ্যে মণ্ডপে ভিড়ের চাপ থেকে বিপর্যয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে। মৃতদের তালিকায় একাধিক নাবালক রয়েছে। ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় দুর্গাপুজোর আনন্দ মুহূর্তে পরিণত হল শোকে। উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের পুজোমণ্ডপে পদপিষ্টের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯। নিহতদের মধ্যে রয়েছে মাত্র সাত বছরের এক শিশু। মৃতদের তালিকায় একাধিক নাবালক ও তরুণ-তরুণীর নামও রয়েছে। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২৫ জন বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে। দুর্ঘটনার পর পুজোমণ্ডপে প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন।

শনিবার, ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় আচমকাই ভিড়ের চাপে বিপর্যয় ঘটে। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বহু দর্শনার্থী মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে। সেই সময় মণ্ডপের ভিতরে ও বেরনোর পথে ভিড় জমে যায়। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

দুর্ঘটনার পর আহতদের উদ্ধার করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ-সহ শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাতভর চিকিৎসার পরে ১১ জনকে রবিবার সকালে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আরও ১৪ জনকে ভোরের দিকে অ্যাপোলো হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

আহতদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে পরিবারের তরফে উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলেও পরিবার সূত্রে দাবি করা হয়েছে। তবে চিকিৎসাধীন প্রত্যেকের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হাসপাতাল বা প্রশাসনের সর্বশেষ বিবৃতি যাচাই করা জরুরি।

চোরবাগান দুর্ঘটনায় মৃতদের তালিকা

প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, চোরবাগান সর্বজনীনের পদপিষ্টের ঘটনায় মৃত ১৯ জনের নাম ও বয়স হল—

১. শ্রীপর্ণা পোদ্দার — ২৬ বছর
২. মিঠু মণ্ডল — ৪৫ বছর
৩. আকৃতি কুমারী — ১৭ বছর
৪. বর্ণালী হালদার — ১৭ বছর
৫. শুভম শঙ্কর — ৩৩ বছর
৬. আরতি সরকার বিশ্বাস — ৪৫ বছর
৭. টগর বেজ — ৩৭ বছর
৮. সন্দীপ বেজ — ১৪ বছর
৯. তানিয়া বিশ্বাস — ১৮ বছর
১০. কল্পনা জানা — ৪৬ বছর
১১. বিকাশ ভট্টাচার্য — ৬৬ বছর
১২. স্নেহা ভাণ্ডারী — ২০ বছর
১৩. পিয়ালি প্রামাণিক — ২৫ বছর
১৪. প্রিয়া সমাদ্দার — ১৮ বছর
১৫. প্রাঞ্জল সরকার — ১৩ বছর
১৬. দিলীপ ঘোষ — ৫৯ বছর
১৭. দীপালি ঘোষ — ৫৪ বছর
১৮. অভিষেক শ্রীবাস্তব — ৩৮ বছর
১৯. আয়ংশ কুমার শ্রীবাস্তব — ৭ বছর

এই তালিকায় শিশু ও কিশোরদের উপস্থিতি দুর্ঘটনার ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

মৃতদের পরিচয় প্রকাশ্যে আসার পর একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যুর আশঙ্কাও সামনে এসেছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, টগর বেজ ও সন্দীপ বেজ একই পরিবারের সদস্য হতে পারেন। দিলীপ ঘোষ ও দীপালি ঘোষ স্বামী-স্ত্রী বলে জানা গিয়েছে।

অন্যদিকে, অভিষেক শ্রীবাস্তব ও সাত বছরের আয়ংশ কুমার শ্রীবাস্তব বিহারের একই পরিবারের সদস্য বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে প্রত্যেকের পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়ে সরকারি বা পরিবারের তরফে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া না গেলে এই দাবিগুলিকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সন্ধ্যায় প্রবল বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর মণ্ডপের ভিতরে ও প্রবেশপথে ভিড় বাড়তে থাকে। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে অনেকে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন। আবার ঠাকুর দেখা হয়ে গেলেও বৃষ্টির কারণে কিছু দর্শনার্থী বেরনোর পথে অপেক্ষা করছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।

এর ফলে একই জায়গায় প্রবেশ ও বেরনোর জন্য মানুষের চাপ বেড়ে যায়। একসঙ্গে বহু মানুষের চলাচলের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হলে পদপিষ্টের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও বৃষ্টি, অতিরিক্ত ভিড় এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাকে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া, উদ্যোক্তাদের একটি ঘোষণাকে ঘিরেও অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, ওই ঘোষণার পরেই দর্শনার্থীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়। তবে ঘোষণাটি ঠিক কী ছিল এবং দুর্ঘটনার সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

চোরবাগানের ঘটনায় পুজোমণ্ডপে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশ ও বেরনোর পথের ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দর্শনার্থীদের সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্ঘটনার পর উদ্যোক্তা ও নিরাপত্তারক্ষী-সহ ১২ জনকে আটক করা হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও দায় চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা তদন্তের ফলের উপর নির্ভর করবে।

এই ঘটনার পর কলকাতার একাধিক বড় পুজোমণ্ডপে দর্শনার্থীদের প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে যাতে নতুন করে কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে, সেই আশঙ্কা থেকেই এই পদক্ষেপ বলে জানা যাচ্ছে।

দুর্গাপুজোর মতো বড় জনসমাগমের অনুষ্ঠানে নিরাপদ প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারকাজের ব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, চোরবাগানের ঘটনা তা ফের সামনে এনে দিল। তবে এই বিপর্যয়ের নির্দিষ্ট কারণ ও কারও গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তের পরেই স্পষ্ট হবে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

Advertisementspot_img

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর