করম পরব, বাংলায় কথ্য ভাষায় কর্ম নামেও পরিচিত, ভারতের ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তিশগড়, আসাম ও বাংলাদেশে এক ঐতিহ্যবাহী উপজাতীয় ফসল উৎসব। এই পূজা নিবেদিত হয় শক্তি, যৌবন ও সমৃদ্ধির প্রতীক করম দেবতার উদ্দেশ্যে। ভক্তদের বিশ্বাস, করম পূজার মাধ্যমে ভালো ফসল, স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধির আশীর্বাদ লাভ করা যায়।
প্রতি বছর ভাদ্র মাসের পূর্ণিমার একাদশী তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়, যা সাধারণত আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে পড়ে। বিশেষত অবিবাহিত তরুণীরা ৭ থেকে ৯ দিন ধরে উপবাস করে চারা রোপণ করে। উৎসবের দিনে গ্রামবাসীরা বন থেকে কাঠ, ফুল ও ফল সংগ্রহ করে আনেন, যা করম পূজায় ব্যবহার হয়। এই সময় ঢোলের তালে নাচ-গান, দলবদ্ধ পূজা ও ভক্তিমূলক রীতি সমগ্র পরিবেশকে আনন্দমুখর করে তোলে।


করম পরব কী? কেন পালন করা হয়? এই উৎসবের মাহাত্ম্য জানলে চমকে যাবেন

করম উৎসবের আচার অনুষ্ঠান
উৎসবে নয় রকম বীজ যেমন ধান, গম ও ভুট্টা ঝুড়িতে রোপণ করা হয়, যাকে জাওয়া বলা হয়। তরুণীরা উপবাস থেকে এই চারা লালন করেন। করম গাছের ডাল কেটে এনে গ্রামে পূজা করা হয়। গ্রামের পুরোহিত বা পাহান পূজা পরিচালনা করেন। শস্য, মদ ও পাখি উৎসর্গ করে করম দেবতার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা হয়। পূজার পরবর্তী সকালে করম শাখা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
এই উৎসব শুধু পূজা নয়, বরং এক সামাজিক মিলনমেলা। ভক্তরা সারারাত গান ও নাচে মাতেন। করম নৃত্য নামে পরিচিত এই নৃত্য উপজাতীয় সংস্কৃতির অন্যতম প্রতীক। মেয়েরা জাওয়া ফুল বিনিময় করে বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্ব ও মঙ্গল কামনা করে।
করম পূজার পেছনের গল্প
করম পূজা নিয়ে বিভিন্ন কিংবদন্তি প্রচলিত। একটি মতে, সাত ভাই কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকায় স্ত্রীরা মাঠে খাবার নিয়ে যেতে ভুলে যায়। ভাইরা ফিরে এসে দেখে স্ত্রীদের করম গাছের চারপাশে নাচতে। রাগে এক ভাই করম ডাল নদীতে ফেলে দেয়। এতে দেবতা অপমানিত হন এবং পরিবারের সর্বনাশ নেমে আসে। পরে করম দেবতার পূজার মাধ্যমে তারা আবার সমৃদ্ধি লাভ করে।


আরেকটি কাহিনিতে বলা হয়, এক ধনী বণিক সমুদ্রযাত্রা শেষে ফিরে এসে দেখে সবাই করম উৎসবে ব্যস্ত। ক্রোধে সে করম গাছ উপড়ে ফেলে, ফলে তার জাহাজ ডুবে যায়। পরে করম দেবতাকে সন্তুষ্ট করার পর তার সমৃদ্ধি ফিরে আসে।
প্রকৃতি আর কৃষির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক
করম পূজা প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রতীক। গাছপালা ও মাটিকে জীবনের উৎস হিসেবে মান্য করে ভক্তরা এই উৎসব পালন করেন। কৃষিজীবী মানুষদের বিশ্বাস, করম দেবতা সন্তুষ্ট হলে ফসল উর্বর হয় এবং জীবনে সমৃদ্ধি আসে।
আজও ঝাড়খণ্ড, বিহার, পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম, ওড়িশা ও বাংলাদেশে এই উৎসব বিপুল ভক্তি ও আনন্দের সঙ্গে পালিত হয়। করম পরব শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও প্রকৃতির সঙ্গে এক অদ্বিতীয় বন্ধনের প্রতীক।








