বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্কের সমীকরণ। ভোট-পরবর্তী ধাক্কা, সাংসদদের একের পর এক দলত্যাগ এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের আবহে এবার প্রকাশ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন কল্যাণ। আর তার পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—দলের হাল ধরতে কি আবার আগের মতো সক্রিয় ভূমিকা নেবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, নাকি পারিবারিক সমীকরণকেই প্রাধান্য দেবেন?
বৃহস্পতিবার কার্যত বিস্ফোরণ ঘটান তৃণমূলের আইনজীবী-সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, দলের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তীব্র আক্রমণ শানিয়ে তিনি বলেন, অভিষেকের নেতৃত্বের কারণেই দলকে নানা বিতর্ক ও জনরোষের মুখে পড়তে হয়েছে। এমনকি দলে তাঁর ও অভিষেকের মধ্যে একজনকে বেছে নেওয়ার বার্তাও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশে ছুড়ে দেন তিনি।
এই ক্ষোভের সূত্রপাত একটি আইনি মামলাকে ঘিরে। কল্যাণের দাবি, বুধবার গভীর রাতে তাঁর ছেলে শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করে জানানো হয় যে, বিধায়কদের স্বাক্ষর জালিয়াতি সংক্রান্ত মামলায় তাঁদের আর আইনজীবী হিসেবে প্রয়োজন নেই। সেই ঘটনার পর থেকেই ক্ষোভ চরমে পৌঁছায়।
দলীয় সূত্রের দাবি, প্রকাশ্যে অনেকে মুখ না খুললেও তৃণমূলের ভিতরে অভিষেকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বহু নেতা। সেই কারণেই কল্যাণের মন্তব্যকে অনেকেই ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং দলের একাংশের জমে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন তৃণমূলের প্রাক্তন মুখপাত্র ঋজু দত্ত। তাঁর বক্তব্য, ২০২১ সালের পর থেকেই অভিষেককে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। কিন্তু পারিবারিক স্নেহের কারণে তিনি সেই পথে হাঁটেননি। ফলে আজ দলের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেই দাবি তাঁর।
রাজনৈতিক মহলে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে বৃহস্পতিবারের ঘটনাপ্রবাহ। ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকে নিয়মিত কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করছিলেন ঘনিষ্ঠ নেতারা। কিন্তু এদিন সেখানে যাননি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, ঘটনা জানানো সত্ত্বেও সারাদিন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি দলের শীর্ষ নেতৃত্বও।
অন্যদিকে, কুণাল ঘোষও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি অনুগত থাকলেও দলের ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে চুপ করে থাকবেন না। তাঁর মতে, লোকসভায় একাধিক সাংসদের দলত্যাগ তৃণমূলের সংসদীয় নেতৃত্বের ব্যর্থতারই ফল।
দলের তরুণ নেতৃত্বের একাংশও এখন অভিষেকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। ছাত্রনেতা কোহিনূর মজুমদারের বক্তব্য, সংগঠনকে পুনর্গঠন করতে হলে অভিষেককে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে সাধারণ কর্মীর ভূমিকায় ফিরিয়ে আনা উচিত।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, বাস্তব রাজনীতিতে এই সমীকরণ এতটা সহজ নয়। পরিবারকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলগুলিতে উত্তরাধিকার এবং ক্ষমতার ভারসাম্য সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই কারণেই অভিষেককে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্কের মাঝেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন দলীয় ঐক্য রক্ষা করা। আগামী দিনে তিনি কোন পথ বেছে নেন, তার উপরই নির্ভর করবে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিশা।



