আরজি কর হাসপাতালে মহিলা চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পর বিচারের দাবিতে পথে নেমেছেন জুনিয়র ডাক্তাররা। শুক্রবার, এসএসকেএম হাসপাতালের অডিটোরিয়ামে তাদের সংগঠন ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডাক্তার ফ্রন্ট’ গণ কনভেনশনের আয়োজন করে। সেখানে সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি, প্রবীণ চিকিৎসক, অভিনেতা, পরিচালক, এবং সাধারণ মানুষদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
প্রধান দাবিসমূহ:
- পাঁচ দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন জুনিয়র ডাক্তাররা।
- হাসপাতালগুলিতে ‘হুমকি সংস্কৃতি’র অবসান এবং নির্যাতিতার প্রতি ন্যায়বিচার।
- আন্দোলনকারীরা ‘অপপ্রচার’ বন্ধ করার আহ্বান জানান এবং বলেন, তাঁদের দাবি নতুন কিছু নয়, বরং পূর্বেই উত্থাপিত পাঁচ দফা দাবি বহাল রয়েছে।
মহাসমাবেশের পরিকল্পনা:
আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর এবং ২ অক্টোবর জুনিয়র ডাক্তারদের নতুন কর্মসূচি রয়েছে। ২ অক্টোবর মহালয়ার দিনে ধর্মতলায় মহামিছিল ও মহাসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।
জনপ্রতিনিধিদের প্রতিক্রিয়া:
প্রবীণ চিকিৎসক এবং সমাজকর্মীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা কনভেনশনে বক্তব্য রাখেন। তাঁরা সকলেই বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং রাজ্যের বিচারব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
মীর:
গণ কনভেনশনে উপস্থিত ছিলেন মীরও। তিনি বলেন, “এটাই আসল ছবি, যা ৫০ দিন ধরে চলছে। আমরা বিচার চাই। মুখ্যমন্ত্রী উৎসবে ফিরতে বলেছিলেন। ডাক্তারেরা বন্যার ত্রাণ দিতে গিয়ে উৎসবে ফিরেছেন। আমরা যা পারিনি, তা ডাক্তারেরা করে দেখিয়েছেন। এটা মানবিকতার উৎসব। এতে কোনও ভেদাভেদ নেই।’’ আরজি কর আবহে যে তারকারা মুখ খোলেননি তাঁদের কটাক্ষ করে মীরের বার্তা, “যাঁরা মুখ খুলতে পারেন না, তাঁদের এত কিসের ভয়? পুরস্কার না পাওয়ার ভয় কি? দোষীদের ‘গারদ শুভেচ্ছা, বাকিদের শারদ শুভেচ্ছা’।”
বোলান গঙ্গোপাধ্যায়:
সমাজকর্মী বোলান গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “দলীয় রাজনীতিতে আর বিশ্বাস রাখছেন না সাধারণ মানুষ। এই ঘটনায় ফাস্টট্র্যাক আদালতের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। আমাদের দেশে বিচারপতির সংখ্যা কম। বিচার হয় না তাই। তদন্ত কমিশন আদতে সব ঠান্ডা ঘরে পাঠিয়ে দেয়। তদন্ত কবে শেষ হবে, কেউ বলতে পারবেন না। জুনিয়র ডাক্তারেরা বুড়ো হয়ে যাবেন। এই বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতে পারে একমাত্র জনগণ। সুপ্রিম কোর্টকে চাপ দিতে হবে। নাগরিক সমাজ দ্রুত বিচার চাইছেন, এই বার্তা পৌঁছে দিতে হবে।”
অভিনেত্রী দেবলীনা দত্ত:
টলিউড অভিনেত্রী দেবলীনা দত্ত বলেন, “থ্রেট কালচার ভুলে গেলে চলবে না। নির্যাতিত কোনও মহিলা না হয়ে পুরুষও হতে পারতেন। হুমকি সংস্কৃতির কারণেই এ সব হচ্ছে। তার বিরুদ্ধেই আমাদের লড়াই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই। হুমকি দেওয়া মানেই ভয় পাওয়া। তাঁরা ভয় পাচ্ছেন বলেই হুমকি দিচ্ছেন।”
কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়:
কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “এই আন্দোলন স্বাভাবিক নয়। ডাক্তারদের যখন রাস্তায় বসতে হচ্ছে, বিচার চাইতে হচ্ছে, বুঝতে হবে, সব ঠিক নেই। এই সময়গুলি সুখের নয়। জুনিয়র ডাক্তারদের বলব, আপনারা একা নন। কোটি কোটি মানুষ আপনাদের সঙ্গে আছেন। সন্দীপ ঘোষরা সব জায়গায় আছেন। তাঁদের সাফাইয়ের সময় এসেছে। আপনারা শিরদাঁড়া সোজা রাখুন। বিচার পেতে সময় লাগবে। আমরা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করব। এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা প্রত্যেকের শাস্তি হোক।”
এসএসকেএমের ডিরেক্টর মণিময় বন্দ্যোপাধ্যায়:
মণিময় বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “জুনিয়র ডাক্তারেরাই আমাদের স্তম্ভ। এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা যে কোনও হাসপাতালে ঘটতে পারে, তা কল্পনাও করা যায় না। এর সঙ্গে যাঁরা সরাসরি বা পরোক্ষ ভাবে যুক্ত, তাঁদের সকলকে চিহ্নিত করা হোক। উপস্থিত সকলকে মতামত দিতে বলেন মণিময়। সকলের মতামতের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে বলে জানান তিনি।”
মূর্তি স্থাপনের প্রস্তাব:
আরজি কর হাসপাতাল চত্বরে প্রতীকী যন্ত্রণাদীর্ণ নারীমূর্তি স্থাপনের প্রস্তাব দেন আন্দোলনকারীরা, যা ২ অক্টোবর স্থাপিত হতে পারে। এই আন্দোলন শুধু বিচার চাওয়ার নয়, সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে অব্যাহত থাকবে বলে জানান জুনিয়র ডাক্তাররা। তাঁদের বক্তব্য, “বিভিন্ন মহলে তাঁদের আন্দোলন নিয়ে নানা অপপ্রচার চলছে। অনেকে বলছেন, তাঁরা নতুন নতুন দাবি করছেন। কিন্তু তা সঠিক নয়। পাঁচ দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের লড়াই চলবে।”



