‘আর বেশি দিন বাঁচব না’, অনশনে অসুস্থ পড়ুয়ার হুঁশিয়ারি, ২০ অগস্ট সোরেনের বাড়ি ঘেরাওয়ের ডাক

JPSC-JSSC পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে রাঁচিতে পড়ুয়াদের আন্দোলন ২৩ দিনে। অনশনরত প্রেম নায়কের শারীরিক অবস্থা সংকটজনক, ২০ অগস্ট মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাওয়ের ঘোষণা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ঝাড়খণ্ডে JPSC-JSSC পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে পড়ুয়াদের আন্দোলন আরও তীব্র হচ্ছে। রাঁচিতে চলা এই আন্দোলন রবিবার ২৩ দিনে পড়েছে, আর অনশন চলছে ১৩ দিন ধরে। অনশনরত আন্দোলনকারী প্রেম নায়কের দাবি, তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি সংকটজনক এবং সরকার তাঁদের দাবিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। একইসঙ্গে ২০ অগস্ট মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের (Hemant Soren) বাড়ি ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে আন্দোলনকারীদের সংগঠন JPSC-JSSC Reforms Manch।

প্রেম নায়ক জানিয়েছেন, শুক্রবার থেকে তাঁর জ্বর এসেছে। চিকিৎসার জন্য প্রশাসনের তরফে তাঁকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও দাবি করেছেন তিনি। তবে চিকিৎসার জন্য যেতে রাজি হননি বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারী। তাঁর অভিযোগ, আর এক আন্দোলনকারী দেবেন্দ্রনাথ মাহাতোকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁকে আর আন্দোলনস্থলে ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না।

আন্দোলনকারীদের দাবি, JSSC-CGL পরীক্ষা এবং ১১তম থেকে ১৩তম JPSC পরীক্ষা বাতিল করতে হবে। পাশাপাশি পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের তদন্তে CBI তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। ঝাড়খণ্ডের বাইরের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে তদন্তের দাবিও তুলেছে JPSC-JSSC Reforms Manch।

২০ অগস্ট সোরেনের বাড়ি ঘেরাওয়ের ডাক

আন্দোলন আরও বড় আকার নেওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে ২০ অগস্টের কর্মসূচিতে। ওই দিন মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও করার কথা জানিয়েছে আন্দোলনকারীরা। যদিও প্রেম নায়কের বক্তব্য, এ নিয়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং কর্মসূচির বিস্তারিত রূপরেখা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তখনও হয়নি।

তিনি ‘জেল ভরো আন্দোলন’-কে বাড়ি ঘেরাওয়ের তুলনায় বেশি কার্যকর বলে মত দিয়েছেন। পাশাপাশি দাবি আদায়ে স্কুল ও কলেজ বন্ধ রাখার মতো কর্মসূচির কথাও বলেছেন তিনি।

এদিকে রবিবার ঝাড়খণ্ডের ২৪টি জেলার সদর দফতরে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন এবং কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর (Rahul Gandhi) কুশপুতুল পোড়ানোর কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে আন্দোলনকারীরা। প্রথমবারের মতো মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও সামনে এসেছে।

কংগ্রেসের সমর্থন প্রত্যাহারের দাবিও

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, JMM-কংগ্রেস জোট সরকার তাঁদের দাবির বিষয়ে যথেষ্ট পদক্ষেপ করছে না। JPSC-JSSC Reforms Manch-এর নেতা রবীন্দ্র পাসোয়ান দাবি করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের কথা না শুনলে কংগ্রেসের উচিত জোট সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করা।

আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, রাহুল গান্ধী পড়ুয়াদের পাশে থাকার কথা বললেও এখনও তাঁদের দাবির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনও পদক্ষেপ হয়নি। সেই কারণেই কংগ্রেসের উপরও চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছেন তাঁরা।

স্বাধীনতা দিবসে ‘তিরঙ্গা যাত্রা’

শনিবার আন্দোলনের ২২তম দিনে রাঁচিতে তিরঙ্গা যাত্রা করেন হাজার হাজার পড়ুয়া ও চাকরিপ্রার্থী। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এই মিছিলের পাশাপাশি নিয়োগ পরীক্ষায় স্বচ্ছতা ও সংস্কারের দাবিও তুলে ধরা হয়।

জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়াম থেকে মিছিল শুরু হয়ে আলবার্ট এক্কা চকে পৌঁছয়। হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে আন্দোলনকারীরা ‘ভারত মাতা কি জয়’ এবং ‘বন্দে মাতরম’ স্লোগান দেন। অনশনরত দুই আন্দোলনকারী, যাঁরা হুইলচেয়ারে ছিলেন, তাঁরাও মিছিলে অংশ নেন।

আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, তাঁদের লড়াই শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি পরীক্ষা বাতিলের জন্য নয়। ঝাড়খণ্ডের নিয়োগ ব্যবস্থার উপর চাকরিপ্রার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই তাঁদের বৃহত্তর লক্ষ্য। পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছেন তাঁরা।

দেবেন্দ্রনাথ মাহাতোকে ঘিরেও উত্তেজনা

আন্দোলনে আলাদা করে নজরে এসেছেন JLKM নেতা দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো। অনশনরত মাহাতো অভিযোগ করেছেন, রাঁচির সদর হাসপাতাল থেকে তাঁকে তিরঙ্গা যাত্রায় যোগ দিতে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। ঘটনাটির একটি ভিডিয়োও সামনে এসেছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

মাহাতোর দাবি, তাঁকে আন্দোলনস্থলে যেতে না দেওয়ার কারণ স্পষ্ট নয়। তাঁর অভিযোগ, আন্দোলনকে দুর্বল বা বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর অভিযোগের সবটাই সমর্থন করে এমন কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সরকার কী বলছে?

আন্দোলনের মধ্যেই নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করেছেন মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন। স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে তিনি স্বীকার করেন, নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন গোটা প্রজন্মের চাকরিপ্রার্থীদের আস্থায় ধাক্কা দিয়েছে। তবে প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী ঘোষণা না করার পক্ষেও সওয়াল করেন তিনি।

সোরেন জানিয়েছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি বা অন্য কোনও অনিয়মে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তাঁর প্রভাব বা পদমর্যাদা যাই হোক না কেন, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে শুধু অভিযুক্তদের ধরলেই হবে না, ভবিষ্যতে যাতে পরীক্ষার প্রক্রিয়ায় কারচুপি না হয়, তার জন্য ব্যবস্থাগত সংস্কারের প্রয়োজন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

সরকারের প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে বার্ষিক পরীক্ষা ক্যালেন্ডার প্রকাশ, প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপদ পরীক্ষা ব্যবস্থা, সময়মতো উত্তরপত্র ও OMR শিট প্রকাশ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে জবাবদিহি বাড়ানো। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা এখনও CBI তদন্ত-সহ আরও কঠোর ও স্বাধীন তদন্তের দাবিতে অনড়।

এরই মধ্যে ১৪তম JPSC সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা করেছে ঝাড়খণ্ড সরকার। সেই সিদ্ধান্তের পরেও ১১তম-১৩তম JPSC এবং JSSC-CGL-সহ অন্য পরীক্ষাগুলির বিষয়ে আন্দোলনকারীদের দাবি বহাল রয়েছে। ফলে সরকারের আশ্বাস এবং পড়ুয়াদের দাবির মধ্যে দূরত্ব এখনও পুরোপুরি কাটেনি।

অনশনরত পড়ুয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার পাশাপাশি ২০ অগস্টের কর্মসূচিকে ঘিরেও নজর রয়েছে প্রশাসনের। একদিকে সরকার নিয়োগ পরীক্ষায় সংস্কার ও নিরপেক্ষ তদন্তের আশ্বাস দিচ্ছে, অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা আরও কঠোর কর্মসূচির পথে হাঁটার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। ফলে আগামী কয়েক দিন ঝাড়খণ্ডের এই ছাত্র আন্দোলনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন