পাকিস্তানের অশান্ত দক্ষিণ-পশ্চিম প্রদেশ বালুচিস্তান আবারও রক্তে ভিজল। একযোগে আত্মঘাতী হামলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে মৃতের সংখ্যা ছাড়াল ১২০। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেই পুরনো অভিযোগের তীর ছুড়ল ইসলামাবাদ—ভারতের মদতের কথা তুলে ধরল পাক প্রশাসন ও সেনা। কিন্তু সেই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ আখ্যা দিয়ে কড়া জবাব দিল নয়াদিল্লি। ভারতের সাফ বক্তব্য, নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতেই বারবার ভারতের নাম টেনে আনে পাকিস্তান।
স্থানীয় ও সেনা সূত্রের খবর, বালুচিস্তানের অন্তত ১২টি জায়গায় একযোগে হামলা চালায় বালুচ বিদ্রোহীরা। লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষ, পুলিশ স্টেশন, আধাসামরিক বাহিনীর শিবির এবং একটি হাই-সিকিউরিটি জেল। সংঘর্ষে এখনও পর্যন্ত অন্তত ১২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৮৩ জন পাক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। পাল্টা অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনীর দাবি, ৯২ জন বালুচ বিদ্রোহীকে হত্যা করা হয়েছে।


এত বড় পরিসরে সমন্বিত হামলা বিরল বলেই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। প্রাদেশিক রাজধানী কোয়েটা-সহ অন্তত ১৪টি শহরে শনিবার ভোররাত ৩টে নাগাদ হামলা শুরু হয়। একাধিক পুলিশ স্টেশনে হামলায় প্রথমে অন্তত আট জন পুলিশকর্মীর মৃত্যু হয়। পরে পাক সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে জানানো হয়, গত ৪৮ ঘণ্টায় মোট ১৩৩ জন ‘জঙ্গি’ নিহত হয়েছে।
এই ঘটনার পরেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি দাবি করেন, এই হামলার পিছনে ভারতের হাত রয়েছে। সেই অভিযোগের দ্রুত জবাব দেয় ভারতের বিদেশ মন্ত্রক। এক বিবৃতিতে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “পাকিস্তানের এই সব ভিত্তিহীন অভিযোগ আমরা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। এগুলি তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরানোর পুরনো কৌশল।”
তিনি আরও বলেন, “পাকিস্তান বরং তাদের নাগরিকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও সমস্যার সমাধানে মন দিক। বালুচিস্তানে বহু বছর ধরেই মানবাধিকার লঙ্ঘন, দমন-পীড়ন ও সেনা অভিযানের অভিযোগ রয়েছে। যখনই সেখানে অশান্তি হয়, তখনই ভারতের নাম টেনে দায় চাপানো পাকিস্তানের অভ্যাস।”


এই হামলার দায় স্বীকার করেছে পাকিস্তানে নিষিদ্ধ সংগঠন বালুচ লিবারেশন আর্মি। হামলার সময় একাধিক ব্যাঙ্কে লুটপাট, পুলিশ স্টেশন ও বহু গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। বালুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে দাবি করেছেন, গত এক বছরে প্রায় ৭০০ জন বিদ্রোহী নিহত হয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, রেললাইন ধ্বংসের জেরে পাকিস্তান রেলওয়ে বালুচিস্তান থেকে দেশের অন্যান্য অংশে ট্রেন পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। রাজ্যের সব হাসপাতালে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। মাস্তুঙ জেলায় একটি জেলে হামলা চালিয়ে ৩০ জনের বেশি বন্দিকে মুক্ত করে দেয় বিদ্রোহীরা। নুশকি জেলায় আধাসামরিক বাহিনীর সদর দফতরে হামলার চেষ্টা হলেও তা প্রতিহত করা হয়।
সব মিলিয়ে, বালুচিস্তানের এই রক্তাক্ত অধ্যায় ফের তুলে ধরল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট—আর সেই সঙ্গে ভারত-পাক কূটনৈতিক সংঘাতেও নতুন করে তাপ বাড়াল।







