নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদের দাবিতে ভারতের পাশে ৪ ইউরোপীয় দেশ, জয়শঙ্করের বৈঠকে বড় সমর্থন

নিউ ইয়র্কে জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকের পর ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিকে সমর্থন করেছে হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র। V4-India বৈঠকে বাড়ল কূটনৈতিক সমর্থন।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে (United Nations Security Council) ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিতে নতুন করে কূটনৈতিক সমর্থন এল ইউরোপ থেকে। নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকের পর ভারতকে স্থায়ী সদস্য করার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে মধ্য ইউরোপের চার দেশ—হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া এবং চেক প্রজাতন্ত্র। চার দেশকে নিয়ে গঠিত ভিসেগ্রাদ গোষ্ঠী (Visegrád Group) ভারতের দাবির পক্ষে একযোগে সওয়াল করেছে।

সোমবার নিউ ইয়র্কে প্রথমবারের মতো V4-India ফর্ম্যাটে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। সেখানে স্লোভাকিয়ার বিদেশমন্ত্রী জুরাজ ব্লানার বলেন, গ্লোবাল সাউথের গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের উদীয়মান শক্তি হিসেবে ভারতের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়া উচিত। বৈঠকের পর জয়শঙ্করও এই প্রথম V4-India বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ভারত দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে। নয়াদিল্লির যুক্তি, ১৯৪৫ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জ তৈরির সময়কার আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য বর্তমানে আর আগের মতো নেই। বিশ্বের অর্থনীতি, জনসংখ্যা এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামোয় থাকা প্রয়োজন—এটাই ভারতের অন্যতম প্রধান বক্তব্য।

বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদে মোট ১৫টি সদস্যরাষ্ট্র রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি স্থায়ী সদস্য—আমেরিকা, রাশিয়া, চিন, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স। বাকি ১০টি আসন অস্থায়ী সদস্যদের জন্য, যাঁদের সাধারণ সভা দুই বছরের মেয়াদের জন্য নির্বাচিত করে। স্থায়ী পাঁচ সদস্যের হাতে ভেটো ক্ষমতা রয়েছে।

ভারত অতীতে একাধিকবার নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারত মোট আটবার অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে, সর্বশেষ ২০২১-২২ মেয়াদে। তবে স্থায়ী সদস্য হওয়ার দাবি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

ভারতের এই দাবির পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান স্থায়ী সদস্যদের মধ্যেও সমর্থন রয়েছে। আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্স এবং ব্রিটেন বিভিন্ন সময়ে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান জানিয়েছে। চিন অবশ্য নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের বিষয়ে একই ধরনের স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। ফলে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের ক্ষেত্রে পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে ঐকমত্য এখনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ভারত, ব্রাজিল, জার্মানি এবং জাপানকে নিয়ে গঠিত G4 গোষ্ঠীও নিরাপত্তা পরিষদের সম্প্রসারণের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে প্রচার চালাচ্ছে। G4-এর প্রস্তাবে বর্তমানে থাকা পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সঙ্গে আরও ছয়টি স্থায়ী সদস্য যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় আফ্রিকা থেকে দু’টি, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে দু’টি, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে একটি এবং পশ্চিম ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে একটি আসনের কথা রয়েছে।

তবে শুধু আন্তর্জাতিক সমর্থন পেলেই ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ নিশ্চিত হবে না। নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো বদলাতে রাষ্ট্রপুঞ্জের সংস্কার প্রক্রিয়ায় সদস্যদেশগুলির মধ্যে বিস্তৃত ঐকমত্য প্রয়োজন। রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার নিয়ে আন্তঃসরকারি আলোচনা এখনও চলমান।

এ দিনের বৈঠকে শুধু নিরাপত্তা পরিষদ নয়, ভারত ও V4 দেশগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বিদেশমন্ত্রীদের বার্ষিক বৈঠক এবং একটি বার্ষিক বিজনেস ফোরাম আয়োজনের পরিকল্পনায় সম্মত হয়েছে দুই পক্ষ। প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের প্রচারে V4-এর এই যৌথ সমর্থন তাই নতুন একটি কূটনৈতিক বার্তা। তবে স্থায়ী সদস্যপদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও অনেকটাই নির্ভর করছে রাষ্ট্রপুঞ্জের সংস্কার প্রক্রিয়া, সদস্যদেশগুলির ঐকমত্য এবং বর্তমান স্থায়ী সদস্যদের অবস্থানের উপর। ফলে নিউ ইয়র্কের এই সমর্থন ভারতের দাবিকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও দৃশ্যমান করলেও, সদস্যপদ পাওয়ার প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন