ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও দুর্ভেদ্য করে তুলতে জোরকদমে কাজ চলছে। ড্রোন, স্টিলথ ফাইটার, ক্রুজ মিসাইল এবং ভবিষ্যতের উচ্চপ্রযুক্তির হুমকির মোকাবিলায় ভারতীয় সেনা (Indian Army) ও প্রতিরক্ষা বাহিনী এখন স্তরে স্তরে সাজানো ‘লেয়ারড এয়ার ডিফেন্স’ (Layered Air Defence) গড়ে তুলছে। এই কৌশলের অন্যতম ভরসা হতে চলেছে আকাশ-এনজি (Akash-NG) এবং ‘অভ্র’ (Abhra)-র মতো আধুনিক মাঝারি-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।
বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র স্বল্প-পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আর যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। শত্রুপক্ষের উন্নত ড্রোন, স্টিলথ যুদ্ধবিমান এবং দূরপাল্লার ক্রুজ মিসাইল ঠেকাতে এমন একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা বলয় প্রয়োজন, যেখানে বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত রাডার এবং অত্যাধুনিক সেন্সর একসঙ্গে কাজ করবে। সেই লক্ষ্যেই ভারতের নতুন প্রজন্মের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ চলছে।
প্রতিরক্ষা মহলের মতে, আধুনিক এয়ার ডিফেন্সের প্রকৃত শক্তি শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লায় নয়, বরং সেন্সর নেটওয়ার্ক, রাডার এবং মোবাইল লঞ্চারের অবস্থান গোপন রাখার ক্ষমতায়। উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ‘অভ্র’-র ফায়ার কন্ট্রোল রাডার প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম, আর ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকর আঘাতের পাল্লা প্রায় ১০০ কিলোমিটার।
এর ফলে শত্রুপক্ষের বিমান রাডারে ধরা পড়লেও তারা বুঝতে পারবে না, ঠিক কোথা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হতে পারে। লঞ্চার জঙ্গল, পাহাড়ি এলাকা কিংবা কোনও হাইওয়ের পাশে ছদ্মবেশে মোতায়েন থাকতে পারে। এই অনিশ্চয়তাই শত্রুর জন্য বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে এবং বিস্তীর্ণ এলাকাকে কার্যত একটি ‘সাইলেন্ট কিল জোন’-এ পরিণত করতে পারে।
আরও বড় পরিবর্তন আনতে চলেছে ‘সেন্সর-ফিউশন’ (Sensor Fusion) প্রযুক্তি। ভবিষ্যতের এই ব্যবস্থায় শুধু রাডারের উপর নির্ভর না করে ইনফ্রারেড সার্চ অ্যান্ড ট্র্যাক (IRST), প্যাসিভ রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি (Passive RF) এবং ইলেকট্রো-অপটিক্যাল ট্র্যাকিং প্রযুক্তিকে একত্রে ব্যবহার করা হবে। এর ফলে শত্রুর বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্রকে আরও নিখুঁতভাবে শনাক্ত ও অনুসরণ করা সম্ভব হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই প্রযুক্তির সাহায্যে নিজেদের রাডার সক্রিয় না করেও শত্রুকে শনাক্ত করা যাবে। অর্থাৎ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ‘সাইলেন্ট মোড’-এ থেকেও লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান নির্ধারণ করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করতে পারবে। এতে শত্রুপক্ষ বুঝতেই পারবে না যে তারা ইতিমধ্যেই নজরদারির আওতায় এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের প্রযুক্তি অ্যান্টি-রেডিয়েশন মিসাইল (Anti-Radiation Missile)-এর কার্যকারিতাও অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। কারণ এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত সক্রিয় রাডারের সংকেত অনুসরণ করে আঘাত হানে। কিন্তু রাডার বন্ধ রেখেই যদি লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও ট্র্যাক করা সম্ভব হয়, তাহলে শত্রুর সেই কৌশল কার্যত ব্যর্থ হতে পারে।
ভারতের প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণের এই নতুন অধ্যায় ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে দেশের আকাশসীমা সুরক্ষাকে আরও শক্তিশালী করবে বলেই মনে করছে প্রতিরক্ষা মহল। বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা, উন্নত সেন্সর প্রযুক্তি এবং মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সমন্বয়ে ভারত একটি আরও কার্যকর ও আধুনিক প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে এগোচ্ছে।



