ভারতীয় সেনাবাহিনীর (Indian Army) অস্ত্রভান্ডারে এবার যোগ হতে চলেছে মার্কিন জ্যাভলিন (Javelin) অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল। আমেরিকার সঙ্গে এই সংক্রান্ত একটি বড় প্রতিরক্ষা চুক্তির পথে এগোচ্ছে ভারত। শুক্রবার ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর (Sergio Gor) জানান, প্রস্তাবিত চুক্তিটি ভারত-মার্কিন প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে চলেছে। চুক্তি চূড়ান্ত হলে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ও আত্মনির্ভর ভারতের আওতায় মার্কিন সহযোগিতায় ভারতেই জ্যাভলিন তৈরির পথ খুলতে পারে।
ভারতীয় সেনা জরুরি ভিত্তিতে জ্যাভলিন ক্ষেপণাস্ত্র কেনার জন্য প্রস্তাব এবং লেটার অব অ্যাকসেপ্ট্যান্স (LOA) স্বাক্ষর করেছে বলে জানা গিয়েছে। এর পরেই চুক্তির সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে। সম্প্রতি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং (Rajnath Singh) এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ (Pete Hegseth)-এর মধ্যে ভারত-মার্কিন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ১০ বছরের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
সেই চুক্তির পরেই জ্যাভলিন নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সার্জিও গোর জানিয়েছেন, এই উদ্যোগ দুই দেশের প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ। তাঁর দাবি, পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারত ও আমেরিকা যৌথ ভাবে জ্যাভলিন মিসাইল উৎপাদনের দিকে এগোবে।
জ্যাভলিন কেনার চেষ্টা অবশ্য ভারতের কাছে নতুন নয়। ২০১০ সাল থেকেই এই মার্কিন অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল কেনার বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে নয়াদিল্লি। কিন্তু এতদিন প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়টি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মার্কিন প্রযুক্তি ভারতকে দেওয়ার বিষয়ে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা ছিল। দীর্ঘ আলোচনার পর সেই অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে বলেই জানা যাচ্ছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের পর জ্যাভলিনের মতো অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে বলে প্রতিরক্ষা মহলের একাংশের মত। গত বছরের নভেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে জ্যাভলিন বিক্রির জন্য ৯৩ মিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ অনুমোদন করেছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সেই প্যাকেজে ১০১টি জ্যাভলিন মিসাইল এবং ২৫টি লঞ্চ ইউনিট থাকার কথা বলা হয়েছিল।
জ্যাভলিন তৈরি করে মার্কিন সংস্থা রেথিয়ন (Raytheon) এবং লকহিড মার্টিন (Lockheed Martin)। এটি মূলত কাঁধে বহনযোগ্য অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক গাইডেড মিসাইল সিস্টেম। অস্ত্রটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল ‘ফায়ার অ্যান্ড ফরগেট’ প্রযুক্তি। অর্থাৎ লক্ষ্যবস্তু লক করার পর ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে অপারেটরকে ক্রমাগত সেটিকে নির্দেশনা দিতে হয় না।
জ্যাভলিনের আক্রমণ পদ্ধতিও বিশেষ। ট্যাঙ্কের সামনের দিক সাধারণত সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত থাকে। সেই কারণে জ্যাভলিন উঁচু পথে উঠে ট্যাঙ্কের তুলনামূলক দুর্বল উপরের অংশে আঘাত করতে পারে। এই ‘টপ-অ্যাটাক’ ক্ষমতাই অস্ত্রটির অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য।
মিসাইলটির পাল্লা ব্যবহৃত সংস্করণ ও কনফিগারেশনের উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে। তবে জ্যাভলিনের আধুনিক সংস্করণগুলি কয়েক কিলোমিটার দূরের সাঁজোয়া লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। একই সঙ্গে লঞ্চারসহ পুরো সিস্টেমটি তুলনামূলক ভাবে বহনযোগ্য হওয়ায় পদাতিক বাহিনীর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
তবে ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু জ্যাভলিন কেনা নয়, বরং প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতার সম্ভাব্য হস্তান্তর। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে দেশে উৎপাদনের উপর জোর দিচ্ছে নয়াদিল্লি। ফলে জ্যাভলিন চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তা ভারত-মার্কিন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।



