ভারত-জাপান সম্পর্কে নতুন গতি, প্রযুক্তি থেকে প্রতিরক্ষা—মোদি-তাকাইচি বৈঠকে একাধিক বড় সিদ্ধান্ত

ভারত-জাপান শীর্ষ বৈঠকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের লক্ষ্য নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ভারত (India) ও জাপান (Japan)-এর কৌশলগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হল দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকে। নয়াদিল্লির (New Delhi) হায়দরাবাদ হাউসে (Hyderabad House) অনুষ্ঠিত ১৬তম ভারত-জাপান বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) জানান, প্রযুক্তি এখন দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং বিনিয়োগের মতো একাধিক ক্ষেত্রে নতুন সহযোগিতার ঘোষণা করা হয়েছে।

যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে মোদি বলেন, ভারত ও জাপানের ‘স্পেশাল স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড গ্লোবাল পার্টনারশিপ’ পারস্পরিক আস্থা ও দীর্ঘদিনের সহযোগিতার ভিত্তিতে আরও নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে চলেছে। তাঁর মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়ে দুই দেশের বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ভারত সফরে আসা জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি (Sanae Takaichi)-কে স্বাগত জানিয়ে মোদি তাঁকে জাপানের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করেন এবং একজন দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রতীক বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, তাকাইচির জন্মস্থান নারা (Nara) ভারত ও জাপানের অভিন্ন বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

প্রতিরক্ষায় প্রথম যৌথ কো-ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প

বৈঠকের অন্যতম বড় ঘোষণা হল ভারত ও জাপানের প্রথম যৌথ প্রতিরক্ষা কো-ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প। প্রধানমন্ত্রী জানান, এই উদ্যোগের মাধ্যমে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরি হবে, যা সামুদ্রিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি মুক্ত, উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক (Indo-Pacific) অঞ্চলের লক্ষ্যে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে বলেও তিনি জানান।

সেমিকন্ডাক্টর ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে যৌথ রোডম্যাপ

অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সেমিকন্ডাক্টর (Semiconductor), কোয়ান্টাম প্রযুক্তি (Quantum Technology) এবং বৈশ্বিক সাপ্লাই চেন (Supply Chain) শক্তিশালী করার জন্য একটি যৌথ রোডম্যাপ তৈরি করেছে ভারত ও জাপান। মোদির কথায়, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে নতুন উদ্যোগ

শীর্ষ বৈঠকে ‘ইন্ডিয়া-জাপান বায়োগ্যাস ইনিশিয়েটিভ’ (India-Japan Biogas Initiative)-এরও ঘোষণা করা হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় ভারতে একাধিক বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে। সরকারের আশা, এর মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে, পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বিনিয়োগ বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য

প্রধানমন্ত্রী জানান, গত এক বছরে ভারত ও জাপানের মধ্যে প্রায় ১২০টি নতুন ব্যবসায়িক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে ভারতে প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে। আগামী এক দশকে জাপান থেকে মোট ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

বৈঠকে ভারতের প্রতিনিধিদলে ছিলেন বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর (S. Jaishankar), জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল (Ajit Doval) এবং বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি (Vikram Misri)-সহ একাধিক শীর্ষ আধিকারিক।

এর আগে রাষ্ট্রপতি ভবনে (Rashtrapati Bhavan) সানায়ে তাকাইচিকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অফ অনার প্রদান করা হয়। তিন দিনের সরকারি সফরে তিনি ১ থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত ভারতে রয়েছেন। এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ভারত-জাপান সম্পর্ককে প্রযুক্তি, অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আরও গভীর করা।

দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের এই বৈঠককে ভারত-জাপান সম্পর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক মহলের একাংশ। বিশেষ করে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং কৌশলগত সহযোগিতায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি আগামী দিনে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন