বিশ্বের চোখে ভারতের ভাবমূর্তি কেমন? পিউ সমীক্ষায় চমক, সবচেয়ে পছন্দ শ্রীলঙ্কার

৮০তম স্বাধীনতা দিবসের আবহেই ভারতের বিশ্ব-ভাবমূর্তি নিয়ে পিউ রিসার্চ সেন্টারের সমীক্ষা। শ্রীলঙ্কায় সর্বাধিক ইতিবাচক মত, পাকিস্তানে ৯১ শতাংশের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

৮০তম স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) যখন ২০৪৭-এর ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্নপূরণে যুবশক্তির উপর আস্থা রাখার বার্তা দিলেন, ঠিক সেই সময়েই প্রকাশ্যে এল বিশ্বের চোখে ভারতের ভাবমূর্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি। পিউ রিসার্চ সেন্টারের (Pew Research Center) ৩৬ দেশের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, সামগ্রিক ভাবে ভারত সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাবই কিছুটা এগিয়ে। তবে দেশভেদে ছবিটা বেশ নাটকীয়।

শনিবার ১৫ অগস্ট দেশজুড়ে পালিত হয়েছে ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস। এদিন লালকেল্লা থেকে টানা ১৩তম বার স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যের বড় অংশ জুড়ে ছিল তরুণ প্রজন্ম, নারীশক্তি, কৃষক ও শ্রমিকদের ভূমিকা এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি ‘বিকশিত দেশ’-এ পরিণত করার লক্ষ্য।

মোদীর কথায়, দেশের তরুণদের উপর তাঁর গভীর আস্থা রয়েছে। সেই আস্থার জায়গা থেকেই যুবসমাজের জন্য বিশেষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI প্রশিক্ষণের কথাও ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। দ্রুত উন্নয়ন, আত্মনির্ভরতা এবং দেশের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উপরও জোর দেন তিনি।

কিন্তু ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসের আবহেই সামনে এসেছে আরও একটি প্রশ্ন—বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ ভারতকে কী ভাবে দেখছেন? সেই উত্তর খুঁজতেই ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ৩৬টি দেশে ৪২,১৫১ জন প্রাপ্তবয়স্কের উপর সমীক্ষা চালিয়েছে পিউ রিসার্চ সেন্টার।

সমীক্ষার সামগ্রিক ফল বলছে, ৩৬টি দেশে গড়ে ৪৫ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। বিপরীতে ৪১ শতাংশের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক। অর্থাৎ, বিশ্বের মানুষের চোখে ভারতের ভাবমূর্তি পুরোপুরি একমুখী নয়; ইতিবাচক মনোভাব কিছুটা এগিয়ে থাকলেও দেশভেদে পার্থক্য যথেষ্ট বড়।

সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থান প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কার। সমীক্ষায় প্রায় ৭৯ শতাংশ শ্রীলঙ্কাবাসী ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন। এমনকি প্রায় ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা ভারতকে তাঁদের দেশের অন্যতম প্রধান বন্ধু হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন বলে সমীক্ষার তথ্য উদ্ধৃত করে রিপোর্টে জানানো হয়েছে।

শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে ভারতের ভাবমূর্তি গত কয়েক বছরের তুলনায় আরও শক্তিশালী হয়েছে। ২০২৪ সালের সমীক্ষায় যেখানে ৬৫ শতাংশ শ্রীলঙ্কাবাসী ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছিলেন, এবার সেই হার বেড়ে প্রায় ৭৯ শতাংশ হয়েছে। এই পরিবর্তনের পেছনে দুই দেশের সম্পর্ক এবং শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময় ভারতের সহায়তাকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখা হচ্ছে।

২০২২ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময় শ্রীলঙ্কার পাশে দাঁড়িয়েছিল ভারত। অর্থনৈতিক সহায়তা, ঋণ ও বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার মাধ্যমে দ্বীপরাষ্ট্রটির কঠিন সময় কাটাতে নয়াদিল্লির ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন সাধারণ মানুষের মনোভাবেও পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ইউরোপ ও এশিয়ার একাধিক দেশেও ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখা গিয়েছে। যুক্তরাজ্যে ৭১ শতাংশ, জার্মানিতে ৬৩ শতাংশ, ইতালিতে ৫৬ শতাংশ, জাপানে ৫৫ শতাংশ এবং সুইডেনে ৫৫ শতাংশ মানুষ ভারতের বিষয়ে ইতিবাচক মত দিয়েছেন। কেনিয়াতেও এই হার ৭১ শতাংশ।

তবে প্রতিবেশী দেশগুলির ক্ষেত্রে ছবিটা একেবারেই একরকম নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ৪২ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন, যেখানে ৫১ শতাংশের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক। দুই দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এই পরিসংখ্যান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

পাকিস্তানের ফলাফল অবশ্য সম্পূর্ণ আলাদা। পিউ-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, মাত্র ৭ শতাংশ পাকিস্তানি ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন। বিপরীতে ৯১ শতাংশের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক। দুই দেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা এবং ২০২৫ সালের মে মাসের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই ফলাফল খুব একটা অপ্রত্যাশিত নয়।

পাকিস্তানের পরেই ভারতের প্রতি সবচেয়ে কম ইতিবাচক মনোভাব দেখা গিয়েছে তুরস্কে। সেখানে মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ ভারতের বিষয়ে ইতিবাচক মত দিয়েছেন। অন্যদিকে মালয়েশিয়াতেও ভারতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব উল্লেখযোগ্য।

এশিয়ার অন্যান্য দেশের ফল তুলনামূলক ভাবে ভারতের পক্ষে। জাপান, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং থাইল্যান্ডে উল্লেখযোগ্য অংশের মানুষ ভারতকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন। অর্থাৎ, এশিয়ায় ভারতের ভাবমূর্তি নিয়ে একক কোনও প্রবণতা নেই; দেশভেদে মতামতের যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

ভারতকে নিয়ে আমেরিকার জনমতও গুরুত্বপূর্ণ। পিউ-এর সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। অন্যদিকে ৫০ শতাংশের মতামত নেতিবাচক। পিউ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে আমেরিকায় ভারতের ইতিবাচক রেটিং ছিল ৫১ শতাংশ; ২০২৬ সালে তা কমে ৪৫ শতাংশ হয়েছে।

আমেরিকার ক্ষেত্রে আবার রাজনৈতিক বিভাজনের ছাপও রয়েছে। রিপাবলিকানদের মধ্যে ৪২ শতাংশ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ, মার্কিন জনমতের মধ্যেও ভারতকে দেখার ক্ষেত্রে দলীয় পার্থক্য রয়েছে।

বিশ্বমঞ্চে ভারতের প্রভাব নিয়েও পিউ-এর সমীক্ষায় প্রশ্ন করা হয়েছিল। আমেরিকান উত্তরদাতাদের ৩০ শতাংশ মনে করেন, ভারতের আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়ছে। ৫৪ শতাংশের মতে, ভারতের প্রভাব মোটামুটি একই রয়েছে। মাত্র ১৩ শতাংশ মনে করেন, ভারতের প্রভাব কমছে।

সব মিলিয়ে পিউ রিসার্চ সেন্টারের এই সমীক্ষা দেখাচ্ছে, বিশ্বের চোখে ভারতের ছবি একেবারে সাদা-কালো নয়। একদিকে শ্রীলঙ্কা, ব্রিটেন, জার্মানি, জাপানের মতো দেশে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব শক্তিশালী; অন্যদিকে পাকিস্তান, তুরস্ক ও বাংলাদেশের মতো দেশে নেতিবাচক মনোভাবও স্পষ্ট। স্বাধীনতার ৮০ বছরে বিশ্বমঞ্চে ভারতের প্রভাব যেমন বেড়েছে, তেমনই সেই প্রভাবকে বিভিন্ন দেশের মানুষ কী ভাবে মূল্যায়ন করছেন, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে এক বহুমাত্রিক ছবি।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন