‘১৫ বছরের দুর্নীতির দায় নিরীহদের’, আশিসের মৃত্যুতে কালীঘাটকে নিশানা ঋতব্রতর

আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু ঘিরে তৃণমূলের অন্দরে তীব্র চাপানউতোর, ১৫ বছরের দুর্নীতির দায় নিয়ে কালীঘাটকে নিশানা ঋতব্রতর; পাল্টা অভিষেকের নিশানায় বিজেপি ও সংবাদমাধ্যম।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Ashis Banerjee) আকস্মিক মৃত্যু ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলার রাজনীতি। রবিবার সকালে বীরভূমের রামপুরহাটে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় থেকে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকারকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি হাতে লেখা নোট উদ্ধার হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে এবং মৃত্যুর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে এসেছে তৃণমূলের অন্দরের পুরনো ক্ষোভও। তৃণমূল নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee) অভিযোগ করেছেন, গত ১৫ বছরে রাজ্যে যে দুর্নীতি ও ‘আইনি ভুল’ হয়েছে, তার দায় অনেক সময় নিরীহ ও সৎ রাজনীতিকদেরও বহন করতে হয়েছে। তাঁর দাবি, সেই চাপ ও অপমানের প্রভাব আশিসবাবুর উপরও পড়েছিল।

রামপুরহাটের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পথেই একটি ভিডিও বার্তায় ঋতব্রত বলেন, তৃণমূলের মুষ্টিমেয় মানুষের কাজের দায় গোটা দলের বহু নেতা-কর্মীকেই নিতে হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, এলাকায় তাঁদের কটূক্তি শুনতে হয়েছে, অপমানের মুখেও পড়তে হয়েছে। আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও সেই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

নিজের সঙ্গে আশিসবাবুর একটি কথোপকথনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন ঋতব্রত। তাঁর দাবি, বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার থাকাকালীন যাঁদের অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন, তাঁদের স্থায়ীকরণের বিষয়টি দেখার জন্য আশিসবাবু তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন।

ঋতব্রতের আরও অভিযোগ, গত ১৫ বছরে দলের কাছে বারবার নিজের আপত্তি ও উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, রাজ্যে যা হচ্ছে, তার সবটাই সঠিক নয়—এমন কথা তিনি দলের নেতৃত্বকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কালীঘাটের নেতৃত্ব সেই বক্তব্যকে গুরুত্ব দেয়নি বলেই অভিযোগ ঋতব্রতের।

তাঁর কথায়, বিষয়টি নিয়ে আশিসবাবুর মধ্যে দীর্ঘদিনের আক্ষেপ ছিল। তবে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা চাপের যোগ রয়েছে কি না, তা এখনও তদন্তের বিষয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া নোট, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং অন্যান্য তথ্য খতিয়ে দেখছে।

অন্যদিকে, ঋতব্রতের অভিযোগের পাল্টা সরাসরি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ পোস্টে তিনি আশিসবাবুর মৃত্যুর ঘটনায় বিজেপি এবং সংবাদমাধ্যমের একাংশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

অভিষেকের বক্তব্য, মৃত্যুর আগে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা বলে দাবি করা নোটে ধারাবাহিক অপপ্রচার এবং তাঁকে কালিমালিপ্ত করার যন্ত্রণার কথা উঠে এসেছে। সেই বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না বলেই দাবি করেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, কোনও অভিযোগকে বারবার প্রচারের মাধ্যমে বড় করে তোলার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কী পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তা নিয়ে বিজেপি এবং সংবাদমাধ্যমের একাংশের ভাবা উচিত।

অভিষেক একইসঙ্গে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে দীর্ঘদিনের সৎ ও জনসংযোগে বিশ্বাসী রাজনীতিক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে রাজনীতি এবং সাংবাদিকতারও একটি সীমারেখা থাকা প্রয়োজন—এই প্রশ্ন।

আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রামপুরহাট আসনে তাঁর পরাজয় এবং তৃণমূলের সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। তিনি দীর্ঘদিন রামপুরহাটের বিধায়ক ছিলেন এবং রাজ্য মন্ত্রিসভাতেও দায়িত্ব সামলেছেন। ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিনি বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার ছিলেন।

তবে মৃত্যুর কারণ বা পরিস্থিতি নিয়ে এখনই কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। উদ্ধার হওয়া নোটের সত্যতা, ময়নাতদন্ত এবং পুলিশের তদন্ত—এই তিন ক্ষেত্রের তথ্য সামনে এলেই পুরো ঘটনার স্পষ্ট ছবি পাওয়া সম্ভব। আপাতত আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু ঘিরে তৃণমূলের দুই শিবিরের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ বাংলার রাজনীতিতে নতুন করে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন