বাংলাদেশের জন্য ভারতের অনুদান নিয়ে এবার তৈরি হল দ্বিমুখী হিসাব। ২০২৬–২৭ কেন্দ্রীয় বাজেটে উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বাংলাদেশের নামে ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে ভারত সরকার। সংখ্যার হিসেবে দেখলে এটি গত বছরের বাজেট ঘোষণার তুলনায় কম, কিন্তু বাস্তবে খরচের নিরিখে বিচার করলে এই বরাদ্দ বরং উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজেটের অঙ্ক আর বাস্তব ব্যয়ের এই ফারাকই নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে।
প্রতি বছরই প্রতিবেশী দেশগুলির জন্য উন্নয়ন সহায়তার অঙ্ক ঘোষণা করে ভারত। চলতি বাজেটেও বাংলাদেশ ছাড়াও ভুটান, নেপাল, আফগানিস্তান, মায়ানমার-সহ একাধিক দেশের জন্য অনুদান বরাদ্দ করা হয়েছে। গত অর্থবর্ষে বাংলাদেশের জন্য প্রাথমিক ভাবে ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। কিন্তু বছর শেষে সংশোধিত অঙ্ক নেমে আসে মাত্র ৩৪ কোটি ৪৮ লক্ষ টাকায়—অর্থাৎ ঘোষিত বরাদ্দের এক তৃতীয়াংশও শেষ পর্যন্ত ব্যয় হয়নি।

এই প্রেক্ষিতে এ বছরের বাজেটে বাংলাদেশের জন্য ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দের অর্থ কী? পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের ঘোষিত বরাদ্দের তুলনায় এ বছরের অঙ্ক প্রায় অর্ধেক। কিন্তু বাস্তবে যে অর্থ ব্যয় হয়েছিল—৩৪.৪৮ কোটি—তার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, নতুন বাজেটে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ প্রায় ৭৪ শতাংশ বেশি।
তবে কূটনৈতিক মহলের মতে, বাজেটে ঘোষিত অনুদান কখনওই চূড়ান্ত হিসাব নয়। বছরের মধ্যেই প্রয়োজন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী এই অঙ্ক সংশোধিত হয়। উদাহরণ হিসেবে গত বছর ইরানের চাবাহার বন্দরের কথা উল্লেখ করছেন বিশেষজ্ঞরা। সেখানে প্রাথমিক ভাবে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও পরে সংশোধিত হয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০০ কোটিতে। আবার ভুটানের জন্য ২,১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ ঘোষণা হলেও, বাস্তবে ব্যয় হয়েছিল ১,৯৫০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই অনুদান আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে টানাপড়েন চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরের শাসনপর্বে সেই উত্তাপ বারবার প্রকাশ্যে এসেছে। তা সত্ত্বেও ভারত বাংলাদেশে উন্নয়ন সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ করেনি। ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে যেখানে ১২০ কোটি টাকার অনুদান ঘোষণা হয়েছিল, হাসিনা সরকারের পতন সত্ত্বেও ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে সেই অঙ্ক অপরিবর্তিত রাখা হয়।


এবার ২০২৬–২৭ অর্থবর্ষে ঢাকার জন্য বরাদ্দ নামল ৬০ কোটিতে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এটি ভারতের ‘সতর্ক কিন্তু যোগাযোগ বজায়’ নীতিরই প্রতিফলন। সম্পর্কের ওঠানামার মাঝেও উন্নয়ন সহায়তার মাধ্যমে কূটনৈতিক জানলা খোলা রাখতে চাইছে নয়াদিল্লি।
প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে এ বছরও সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে ভুটান—২,২৮৮ কোটি টাকা। নেপালের জন্য বরাদ্দ ৮০০ কোটি, মলদ্বীপ ও মরিশাসের জন্য ৫৫০ কোটি, শ্রীলঙ্কার জন্য ৪০০ কোটি, আর মায়ানমারের জন্য ৩০০ কোটি টাকা। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলির জন্য মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১২০ কোটি টাকা। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, আফগানিস্তানের জন্য বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় বাড়িয়ে ১৫০ কোটি টাকা করেছে ভারত।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নতুন বাজেটে অনুদান বাড়ল না কমল—এই প্রশ্নের একক কোনও উত্তর নেই। ঘোষণার খাতায় অঙ্ক কমেছে, কিন্তু বাস্তব ব্যয়ের নিরিখে বরাদ্দ বেড়েছে। আগামী বছরে এই ৬০ কোটির কতটা বাস্তবে খরচ হয়, তার উপরই নির্ভর করবে ভারত–বাংলাদেশ কূটনীতির পরবর্তী সমীকরণ।







