ইমরান খানকে আর ‘গুমঘরে’ নয়, নির্দেশ দিল পাক আদালত

ইমরান খান ও বুশরা বিবির বন্দিদশা নিয়ে ইসলামাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশের দিনেই নতুন বিতর্ক পাকিস্তানে। অক্সফোর্ডে পড়া ছয় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর প্রসঙ্গ তুলে ‘দিমাগি নকশাল’ আক্রমণের মুখে সারা তসির।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ইমরান খানের (Imran Khan) জন্য আদালতের নির্দেশে যখন কিছুটা স্বস্তির খবর, তখনই তাঁকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কে উত্তপ্ত পাকিস্তানের সোশ্যাল মিডিয়া। মঙ্গলবার ইসলামাবাদ হাইকোর্ট আদিয়ালা জেল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে, ইমরান খান ও তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবিকে (Bushra Bibi) একাকী বন্দিদশায় রাখা যাবে না। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং ছেলেদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ নিশ্চিত করার নির্দেশও দিয়েছে আদালত। সেই দিনেই ইমরান-সহ অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করা পাকিস্তানের ছয় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র আক্রমণের মুখে পড়েছেন সারা তসির।

ইসলামাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, ইমরান ও বুশরা বিবিকে কোনওভাবেই ‘সলিটারি কনফাইনমেন্ট’-এ রাখা যাবে না। আদিয়ালা জেল কর্তৃপক্ষকে জেলের নিয়ম মেনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ইমরান যাতে তাঁর ছেলেদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

ইমরানের শারীরিক অবস্থা নিয়েও এ দিন মুখ খুলেছেন তাঁর বোন আলিমা খান। তাঁর দাবি, ইমরান সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছেন। তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল বা অসুস্থ হিসেবে তুলে ধরে সমর্থকদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। তবে জেলের ভিতরে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন আলিমা।

এই আবহেই নতুন বিতর্কের সূত্রপাত সারা তসিরকে ঘিরে। পাঞ্জাবের প্রাক্তন গভর্নর সলমন তসিরের (Salman Taseer) মেয়ে সারা সোশ্যাল মিডিয়ায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে একটি মন্তব্য করেন। সেখানে তিনি অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করা পাকিস্তানের ছয় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক পরিণতির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

সারার তালিকায় ছিলেন লিয়াকত আলি খান, হুসেন শহিদ সুরাওয়ার্দি, ফিরোজ খান নুন, জুলফিকার আলি ভুট্টো, বেনজির ভুট্টো (Benazir Bhutto) এবং ইমরান খান। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—পাকিস্তানের সমস্যা কখনও শিক্ষিত রাষ্ট্রনায়কের অভাব ছিল না; বরং প্রশ্ন হল, রাজনৈতিকভাবে তাঁদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হয়েছে।

সারার এই মন্তব্যের পরেই পাকিস্তানের সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে ‘দিমাগি নকশাল’ বলে আক্রমণ শুরু হয়। সম্প্রতি ভারতের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন। সেই শব্দবন্ধই ধার করে সারাকে নিশানা করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সারাকে আক্রমণকারীদের একাংশের বক্তব্য, পাকিস্তানের তথাকথিত ‘এলিট’ শ্রেণি অক্সফোর্ড বা ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসূত্রকে রাজনৈতিক যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করে। সারার বক্তব্যকে সেই ‘এলিট’ মানসিকতারই উদাহরণ বলে কটাক্ষ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সারার বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার দীর্ঘ ইতিহাস। অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করা একাধিক নেতা দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে পৌঁছলেও তাঁদের কারও রাজনৈতিক পরিণতি স্বাভাবিক হয়নি—এই বাস্তবতাকেই সামনে আনতে চেয়েছেন তিনি। ফলে ইমরানের বর্তমান বন্দিজীবনের সঙ্গে পাকিস্তানের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাসকে এক সূত্রে দেখার চেষ্টা হয়েছে তাঁর বক্তব্যে।

ইমরান খানের ক্ষেত্রে আদালতের সাম্প্রতিক নির্দেশ তাই রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে জেলবন্দি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ এবং তাঁর বন্দিদশা নিয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ, অন্যদিকে তাঁকে সমর্থন করে মন্তব্য করা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র বিতর্ক—একই দিনে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দুই বিপরীত ছবি সামনে এসেছে।

ইমরানের সমর্থকদের কাছে আদালতের নির্দেশ স্বস্তির বার্তা হলেও, তাঁর পরিবার এখনও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। আর সারা তসিরকে ঘিরে ‘দিমাগি নকশাল’ বিতর্ক দেখিয়ে দিচ্ছে, পাকিস্তানে ইমরানকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মেরুকরণ এখনও কতটা তীব্র।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন