পুরভোটের আগে বামেদের সঙ্গে জোটের সম্ভাবনা ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এবার এই ইস্যুতে প্রকাশ্যেই আপত্তি জানালেন ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস নেতা ফিরহাদ হাকিম। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, যে সিপিএমের বিরুদ্ধে জীবনের ৩৫ বছর লড়াই করেছেন, সেই দলের সঙ্গে জোটে যাওয়া মানে নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শ ও মূল নীতির সঙ্গে আপস করা।
বুধবার বামেদের সঙ্গে জোটের প্রসঙ্গে নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন একসময়ের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ ফিরহাদ। তাঁর দাবি, বামেদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনের সময় বহু কংগ্রেস ও তৃণমূল কর্মীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। অনেকে শারীরিকভাবে আক্রান্ত হয়েছেন। সেই ইতিহাস ভুলে সিপিএমের সঙ্গে হাত মেলানো উচিত নয় বলেই মনে করেন তিনি।
ফিরহাদ বলেন, “আমরা সবাই কংগ্রেস কর্মী ছিলাম। সেখানে থেকে বামেদের বিরোধিতা করতে পারছিলাম না। ৫৬ হাজার কর্মী মারা গিয়েছে। তারপরেও সেই লড়াই দিতে পারেনি। কংগ্রেসের সঙ্গে ওদের দিল্লিতে যোগ ছিল। আমাদের কাছে বিজেপি সেই সময় ফ্যাক্টর ছিল না। আমরা সিপিএমের বিরুদ্ধে লড়াই করলাম। এর ফলে আমার তিন বন্ধু মারা গেল, অনেকের হাত কাটা হল, অনেককে মারা হল। এই সিপিএমের সঙ্গে জোট মানে বেসিক প্রিন্সিপাল নষ্ট হওয়া।”
‘সিপিএম আমাদের চিরশত্রু ছিল, তার হাত কেন ধরব?’
শুধু রাজনৈতিক অতীতের প্রসঙ্গ তুলেই থামেননি ফিরহাদ। বামেদের সঙ্গে জোটের সম্ভাবনা নিয়ে নিজের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, বিজেপির সমর্থক তিনি নন। কিন্তু যে রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘ কয়েক দশক লড়াই করেছেন, তাদের সঙ্গে হাত মেলানো তাঁর পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
ফিরহাদের বক্তব্য, “বিজেপির সমর্থক আমিও নই। কিন্তু যে দলের জন্য আমরা সব হারিয়েছিলাম। জীবনের ৩৫ বছর লড়াই করেছিলাম। সিপিএম আমাদের চিরশত্রু ছিল। তার হাত কেন ধরব?”
একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন ফিরহাদ হাকিম। তবে বর্তমানে দু’জনের রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা হিসেবে তাঁর এই মন্তব্য তাই রাজনৈতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কংগ্রেস প্রসঙ্গেও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন ফিরহাদ। তাঁর দাবি, কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আসার পরেই বাংলায় দলটির রাজনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘মাই লিডার’ বললেই যে রাজ্যে কংগ্রেসের অবস্থা ভালো হয়ে যাবে, এমনটা মনে করেন না তিনি।
বামেদের সঙ্গে জোট নিয়ে তৃণমূলেও কি মতবিরোধ?
বামেদের সঙ্গে সম্ভাব্য জোট নিয়ে শুধু ফিরহাদ হাকিমই আপত্তি তুলছেন না। সূত্রের খবর, তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরেও এই প্রশ্নে মতপার্থক্য রয়েছে। বর্ষীয়ান সাংসদ সৌগত রায় সম্প্রতি এই প্রসঙ্গে অতীতের রাজনৈতিক ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন।
অন্যদিকে, তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষের বক্তব্যে আবার ভিন্ন সুর শোনা গিয়েছে। তাঁর মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বামেদের সঙ্গে জোট সময়ের দাবি হতে পারে।
ফলে পুরভোটের আগে বামেদের সঙ্গে জোটের সম্ভাবনা ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ ক্রমশ জটিল হচ্ছে। একদিকে বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধী শক্তিগুলিকে একজোট করার প্রশ্ন, অন্যদিকে বামেদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাতের ইতিহাস—এই দুইয়ের মধ্যে কোন পথ বেছে নেয় তৃণমূল, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।



