নর্থইস্টকে ৭ গোলের বন্যায় ভাসিয়ে শিল্ড ফাইনালে ইস্টবেঙ্গল, সামনে ফের ডার্বি

নর্থইস্ট ইউনাইটেডকে ৭-২ গোলে হারিয়ে আইএফএ শিল্ডের ফাইনালে ইস্টবেঙ্গল। ডেভিড লালনসাঙ্গার হ্যাটট্রিকের পর ফাইনালে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে কলকাতা ডার্বি।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

শুরুতেই ধাক্কা। ম্যাচের দেড় মিনিটের মাথায় নিজেদের ভুলে গোল হজম। কিন্তু সেখান থেকেই যেন ঘুম ভাঙল ইস্টবেঙ্গলের। নর্থইস্ট ইউনাইটেডকে কার্যত উড়িয়ে দিয়ে আইএফএ শিল্ডের ফাইনালে পৌঁছে গেল আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের দল। স্কোরলাইন ৭-২। আর এই জয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল নায়ক ডেভিড হমার—দুরন্ত হ্যাটট্রিক করে যিনি লাল-হলুদের প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখলেন।

কিশোর ভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ম্যাচ শুরুর আগেই ইস্টবেঙ্গলের সামনে ছিল একাধিক সমস্যা। জাতীয় দলের দায়িত্বে থাকা বেশ কয়েকজন ফুটবলার নেই। মহম্মদ রশিদকেও প্রথম একাদশে রাখেননি হাবাস। রিজার্ভ বেঞ্চে ছিলেন নতুন দুই বিদেশি আকে লোবা ও লুকাস জিয়োলিনস্কি। সেই পরিস্থিতিতেই শুরুটা হল ভয়াবহ ভুলে।

দেড় মিনিটও পেরোয়নি। নিজেদের বক্সে বল নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ভুল করে বসেন ইস্টবেঙ্গলের ডিফেন্ডার জিভুলিচ। এমন সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন নর্থইস্টের স্ট্রাইকার আলাদিন আজারেই। মুহূর্তের মধ্যে পূর্বা লাচেনপাকে কাটিয়ে বল জালে পাঠিয়ে দেন তিনি।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফের বিপদ। এবার হার্দিক ভাটের ভুলের সুযোগ নিয়ে জিতিন এমএস ঝড়ের গতিতে ঢুকে পড়েছিলেন বক্সে। লাচেনপা কোনওরকমে বিপদ সামলান।

তবে ১০ মিনিটের মাথাতেই ম্যাচে ফিরে আসে ইস্টবেঙ্গল। ডানদিক থেকে ক্রিস ইকোনোমিডিসের মাপা ক্রস। বক্সে অপেক্ষায় ডেভিড। নিখুঁত হেডে বল পাঠিয়ে দিলেন টপ কর্নারে। নর্থইস্টের গোলকিপারের ঝাঁপও রুখতে পারল না সেই শট।

সমতা ফেরার পরই হাবাসের কৌশলগত পরিবর্তন চোখে পড়ে। লালচুংনুঙ্গাকে একটু ডানদিকে সরিয়ে হার্দিক ভাটকে সাহায্য করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। দানি রামিরেজ এবং বিষ্ণু উইংয়ে আরও চওড়া হয়ে খেলতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে নর্থইস্টের আক্রমণের ধার কমে যায়।

২২ মিনিটে ফের আক্রমণ। বাঁদিক থেকে দানি রামিরেজের দুর্দান্ত ক্রস। বক্সে একেবারে ফাঁকায় রোহিত কুমার। সুযোগ নষ্ট করেননি তিনি। নিখুঁত ফিনিশে ইস্টবেঙ্গলকে এগিয়ে দেন রোহিত।

এর পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ লাল-হলুদের হাতে চলে যায়। একক দক্ষতায় একাধিক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে দানি রামিরেজ প্রায় গোল পেয়েই যাচ্ছিলেন। শেষ মুহূর্তে গোললাইন থেকে বল বাঁচিয়ে দেয় নর্থইস্ট।

তবে ৪২ মিনিটে আর রক্ষা হয়নি। আক্রমণে উঠে আসা নর্থইস্টের পিছনে জায়গা পেয়েই পাল্টা আক্রমণে ঝড় তোলে ইস্টবেঙ্গল। ডানদিক দিয়ে উঠে আসেন ক্রিস ইকোনোমিডিস। গোল না করলেও ম্যাচে তাঁর প্রভাব তখন স্পষ্ট। শুরুতে ডেভিডের গোলের অ্যাসিস্ট, এরপর একের পর এক আক্রমণে তাঁর সক্রিয়তা নর্থইস্টের রক্ষণকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও একই ছবি। এবার বিষ্ণুর ক্রস। আবারও ঠিক জায়গায় ডেভিড। গোল করতে কোনও ভুল করলেন না মিজো স্ট্রাইকার। ম্যাচে নিজের দ্বিতীয় গোল করে ইস্টবেঙ্গলের ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেন তিনি।

এরপর ৫৫ মিনিটে আসে ডেভিডের হ্যাটট্রিক। ফের আক্রমণের কেন্দ্রে ক্রিস ইকোনোমিডিস। তাঁর পাঠানো নিখুঁত ক্রসের সদ্ব্যবহার করে নিজের তৃতীয় গোলটি করেন ডেভিড।

ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণভাগে ডেভিডের সবচেয়ে বড় শক্তিই যেন এই ম্যাচে আরও একবার সামনে এল—গোলের সামনে সঠিক জায়গায় অপেক্ষা করা। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নর্থইস্টের বিরুদ্ধে তিন গোল করে ম্যাচের সেরা হয়ে উঠলেন তিনি।

ম্যাচ কার্যত পকেটে ঢুকে যাওয়ার পর একাধিক পরিবর্তন করেন হাবাস। জিভুলিচকে তুলে নেওয়া হয়। মাঠে নামেন নতুন দুই বিদেশি আকে লোবা ও লুকাস জিয়োলিনস্কি।

ম্যাচের ৮৩ মিনিটে অবশ্য নর্থইস্টের হয়ে ফের গোল করেন আজারেই। ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ৫-২।

কিন্তু এরপরই নতুন দুই বিদেশির ঝলক। ৮৫ মিনিটে রশিদের ক্রস থেকে আকে লোবা দুর্দান্ত ফিনিশে গোল করেন। গতি এবং ফিনিশিং—দুটিরই ঝলক দেখা যায় তাঁর খেলায়।

ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গোল করেন লুকাস জিয়োলিনস্কিও। ফলে স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৭-২। অভিষেক ম্যাচে গোল পেলেও ম্যাচের একেবারে শেষে সহজ সুযোগ নষ্ট না করলে তাঁর অভিষেক আরও স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারত।

শেষ বাঁশি বাজার পর স্কোরবোর্ডে ৭-২। শুরুতে যে দল দেড় মিনিটেই গোল খেয়েছিল, সেই ইস্টবেঙ্গলই ম্যাচ শেষ করল পাঁচ গোলের ব্যবধানে জয় নিয়ে।

ফাইনালে ফের কলকাতা ডার্বি

ইস্টবেঙ্গলের এই দুরন্ত জয়ের ফলে আইএফএ শিল্ডের ফাইনালে ফের মুখোমুখি হতে চলেছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী—ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান।

মোহনবাগানের সেমিফাইনাল পারফরম্যান্স খুব একটা স্বস্তি দেয়নি সমর্থকদের। কঠিন পরিস্থিতিতে দলকে বাঁচিয়েছিলেন গোলকিপার বিশাল কাইথ। অন্যদিকে সেমিফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণাত্মক ফুটবল এবং সাত গোলের জয় দুই দলের ফাইনাল ম্যাচ নিয়ে প্রত্যাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

অবশ্য ডার্বিতে আগাম ফলের হিসাব মেলে না। বড় ম্যাচের নিজস্ব চরিত্র রয়েছে। তাই ইস্টবেঙ্গলের সাত গোলের জয় যেমন আত্মবিশ্বাস বাড়াবে, তেমনই ফাইনালে মোহনবাগানও সম্পূর্ণ আলাদা ম্যাচের প্রস্তুতি নিয়েই নামবে।

ডেভিড হমারের হ্যাটট্রিকে নর্থইস্টকে ৭-২ গোলে হারাল ইস্টবেঙ্গল
ডেভিড হমারের হ্যাটট্রিকে নর্থইস্টকে ৭-২ গোলে হারাল ইস্টবেঙ্গল

তবে একটা বিষয় নিশ্চিত—আইএফএ শিল্ডের ফাইনালে ফের কলকাতা ডার্বি। একদিকে ডেভিডের হ্যাটট্রিকের আত্মবিশ্বাসে ভরপুর ইস্টবেঙ্গল, অন্যদিকে সেমিফাইনাল পেরিয়ে আসা মোহনবাগান। লাল-হলুদের সাত গোলের ঝড়ের পর ফাইনালের মঞ্চে কী হয়, এখন সেদিকেই নজর।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন