২২ বছরের অপেক্ষার অবসান। কলকাতা ডার্বিতে মোহনবাগান সুপার জায়ান্টকে (Mohun Bagan Super Giant) ৪-১ গোলে উড়িয়ে ডুরান্ড কাপের ১৭তম ট্রফি ঘরে তুলেছে ইস্টবেঙ্গল (East Bengal FC)। এডমন্ড লালরিন্দিকার (Edmund Lalrindika) দুরন্ত হ্যাটট্রিক, বিপিন সিংয়ের (Bipin Singh) গোল এবং আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের (Antonio López Habas) কৌশলে রীতিমতো একপেশে হয়ে যায় ফাইনাল। ম্যাচ শেষ হতেই তাই হাবাসের গলায় আত্মতৃপ্তির সুর—তাঁর কোচিং জীবনের এটাই সেরা ডার্বি জয়।
ফাইনালের পর ইস্টবেঙ্গল শিবিরে তখন উৎসবের আবহ। ফুটবলারদের গায়ে ‘চ্যাম্পিয়ন’ লেখা টি-শার্ট। লাল-হলুদ পতাকা জড়িয়ে মাঠে নেমে কোচ হাবাসকে অভিনন্দন জানান ক্লাবকর্তা দেবব্রত সরকার। এরপর সেই পতাকাই জড়িয়ে দেওয়া হয় ম্যাচের মহাতারকা এডমন্ডের গায়ে। গ্যালারিতে তখন শুধুই ‘জয় ইস্টবেঙ্গল’ ধ্বনি।
উচ্ছ্বাসের শেষটাও ছিল নজরকাড়া। প্রভসুখন গিল, আনোয়ার আলি, জয় গুপ্তা-সহ ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলাররা মাঠে বসে নরওয়ের তারকা আর্লিং হালান্ডের দলের পরিচিত ‘ভাইকিং ক্ল্যাপ’-এর আদলে উদযাপনে মাতেন। ৪-১ জয়ের রাতে লাল-হলুদ সমর্থকদের কাছে সেই মুহূর্তও হয়ে ওঠে স্মরণীয়।
কিন্তু এই রাতের আসল স্থপতি হাবাসের চোখে কেন এটাই সেরা ডার্বি? স্প্যানিশ কোচের ব্যাখ্যা, অন্য ডার্বিগুলি ফাইনাল ছিল না। এই ম্যাচের সঙ্গে সরাসরি ট্রফি জড়িয়ে ছিল। তাই ফাইনাল জিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দই তাঁর কাছে এই জয়কে আলাদা করে দিয়েছে।
“স্বপ্নের মতো একটা জয় পেলাম আমরা। দলগতভাবে খুব ভালো খেলেছে টিম। পাশাপাশি ব্যক্তিগত নৈপুণ্যেও অনেকে দুর্দান্ত পারফর্ম করেছে”—ফাইনালের পর ফুটবলারদের প্রশংসা করে এমনটাই জানিয়েছেন হাবাস। তাঁর কৌশলে প্রথমার্ধেই চার গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কার্যত নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় ইস্টবেঙ্গল।
এডমন্ডকে নিয়েও উচ্ছ্বসিত হাবাস। প্রচলিত অর্থে ‘পজিটিভ স্ট্রাইকার’ না হয়েও গোল করার ক্ষমতাই তাঁকে আলাদা করে তুলেছে বলে মনে করছেন ইস্টবেঙ্গল কোচ। ফাইনালে সেই দক্ষতারই নিখুঁত প্রদর্শন করেছেন এডমন্ড। মাত্র ১২ মিনিটের ব্যবধানে জোড়া গোলের পর প্রথমার্ধের শেষদিকে হ্যাটট্রিক সম্পূর্ণ করেন তিনি।
এই ম্যাচে গোলরক্ষক প্রভসুখন সিং গিলের (Prabhsukhan Singh Gill) কাছেও ছিল আলাদা আবেগ। ২০২৩ সালে ইস্টবেঙ্গলের হয়ে প্রথম মরশুমে ডুরান্ড কাপের ফাইনালে হারের স্মৃতি ছিল তাঁর। তিন বছর পর সেই একই মঞ্চে ট্রফি হাতে নিয়ে সেই আক্ষেপ মুছে গেল। তার উপর গত তিন মাসের মধ্যে দ্বিতীয় ট্রফি—তাই এই সাফল্যকে বড় প্রাপ্তি হিসেবেই দেখছেন গিল।
ইস্টবেঙ্গলের এই সাফল্য শুধু একটি ট্রফি জয় নয়, ক্লাবের হারানো মর্যাদা ফিরে পাওয়ারও ইঙ্গিত। ২০০৪ সালে শেষবার ডুরান্ড কাপ জিতেছিল লাল-হলুদ। সেই ফাইনালেও প্রতিপক্ষ ছিল মোহনবাগান। এবার ২২ বছর পর ফের সেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়েই ট্রফি জয়। ফলে ডুরান্ড কাপের ইতিহাসে দুই কলকাতা জায়ান্টের শিরোপা সংখ্যা এখন ১৭টি করে।
লিগ পর্বের প্রথম ম্যাচে মোহনবাগানের কাছে ০-১ গোলে হারতে হয়েছিল ইস্টবেঙ্গলকে। তাই ফাইনালের জয়কে প্রতিশোধের ম্যাচ হিসেবে দেখছেন কি না, সেই প্রশ্নে জয় গুপ্তার সোজাসাপ্টা উত্তর—“আমরা জবাব দিয়েছি মাঠে।” কথার বদলে মাঠের পারফরম্যান্সেই যে জবাব দিতে চেয়েছিল দল, ফাইনালের ৪-১ ফলাফলই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
আর বিপিন সিংয়ের জন্য এই রাত আরও বিশেষ। ডার্বিতে এটাই তাঁর প্রথম গোল। ফাইনালের দশম মিনিটে তাঁর গোলেই ইস্টবেঙ্গলের গোলের দরজা খুলেছিল। তারপর এডমন্ডের ঝড়। মাত্র ৪৪ মিনিটেই চার গোল করে ম্যাচ কার্যত নিজেদের পকেটে পুরে নেয় লাল-হলুদ।
তবে একটি ট্রফিতেই থামতে নারাজ মহম্মদ রশিদ। তাঁর বার্তা পরিষ্কার—এই জয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও মরশুমের কাজ এখনও শেষ হয়নি। সামনে আরও বড় ম্যাচ রয়েছে, সেগুলিও জিততে হবে। নিজের এই সাফল্য বাবাকে উৎসর্গ করেছেন রশিদ। অর্থাৎ ডুরান্ড কাপের রাত যতই ঐতিহাসিক হোক, হাবাসের ইস্টবেঙ্গলের চোখ এখন পরের চ্যালেঞ্জে।



