দুর্গাপুর ধর্ষণকাণ্ড ঘিরে রাজ্যজুড়ে উত্তেজনা। এই ঘটনায় প্রথমে রাজ্যের প্রশাসন ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন নির্যাতিতার বাবা। কিন্তু মাত্র একদিনের মধ্যেই তাঁর সুর সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। এবার মুখ্যমন্ত্রীকে “মায়ের মতো” বলে আখ্যা দিয়ে তিনি ক্ষমাও চাইলেন এবং মেয়ের ন্যায়বিচারের (Justice for Durgapur victim) দাবিও জানান।
বুধবার নির্যাতিতার বাবা বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি মায়ের মতো। তাঁকে প্রণাম জানাই। যদি ভুল করে কিছু বলে থাকি, ক্ষমা করবেন। আমি শুধু চাই, আমার মেয়েকে ন্যায়বিচার দিন।” তাঁর কথায়, পরিবারের একমাত্র দাবি, দোষীদের যেন কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়, যাতে বাংলার আর কোনও মেয়েকে এমন নির্যাতনের শিকার না হতে হয়।
এর আগের দিন তিনি ক্ষোভের সুরে বলেছিলেন, “আমার মেয়ের যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। এখন চাই, দোষীরা দ্রুত শাস্তি পাক। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা বাংলা ছেড়ে ওড়িশা চলে যাব।” সেই মন্তব্যে তখন বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার তিনি ফের সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন।
দুর্গাপুর ধর্ষণকাণ্ডের তদন্তে নয়া মোড়:
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার রাতে। অভিযোগ, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রীকে তাঁর সহপাঠী প্রেমিকের সঙ্গে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ (Durgapur Gangrape) করা হয়। এরপরেই শুরু হয় তীব্র পুলিশি তদন্ত। শনিবার থেকেই দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় ওই সহপাঠীকে। পরে গ্রেপ্তার হয় পাঁচ জন স্থানীয় যুবক।
তদন্তে প্রকাশ, সহপাঠীর বয়ান ও নির্যাতিতার বক্তব্যের মধ্যে বিরাট অসঙ্গতি রয়েছে। মঙ্গলবার পুনর্নির্মাণের সময়ও তার বয়ানে ফাঁক ধরা পড়ে, যার পর তাঁকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য:
বৃহস্পতিবার পুলিশ জানায়, ওই ছাত্রের হস্টেল রুম থেকে ১১টি অব্যবহৃত কন্ডোম উদ্ধার হয়েছে। আরও একটি পাওয়া গিয়েছে পরাণগঞ্জের সেই জঙ্গল থেকে, যেখানে ঘটনাটি ঘটেছিল। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই কন্ডোমগুলি ঘটনাটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারে।
তদন্তকারীদের মতে, সহপাঠী ছাত্রটি সম্ভবত একটি সম্পূর্ণ প্যাকেট কিনেছিল, যার একটি ব্যবহৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে ঘটনাস্থলে। এটি এখন মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য, ফরেনসিক রিপোর্ট ও ডিএনএ পরীক্ষার ফল না আসা পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়া সম্ভব নয়।
প্রেমের সম্পর্ক থেকে ভয়ঙ্কর পরিণতি:
সূত্রের খবর, গত পাঁচ মাস ধরে ওই ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ১০ অক্টোবর রাতে তাঁরা কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে যান। স্থানীয় কিছু যুবক তাঁদের একান্ত মুহূর্তে দেখে ফেলে এবং পরে অর্থ দাবি করে। অভিযোগ, অর্থ না দিতে পারায় ছাত্রটি মেয়েটিকে সেখানে রেখে চলে যায়। এরপর ঠিক কী ঘটেছিল, সেটিই এখন তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
নির্যাতিতার বয়ান অনুযায়ী, তাঁকে একজনই ধর্ষণ করেছে, যদিও ধৃতের সংখ্যা ছয়। পুলিশের ধারণা, ফরেনসিক রিপোর্টই বলবে, কে বা কারা প্রকৃত অপরাধী।
মামলার বর্তমান অবস্থা:
বুধবার ধৃতদের দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে তোলা হয়। কোনও আইনজীবী তাঁদের পক্ষে সওয়াল করতে চাননি। আদালত তাঁদের ১০ দিনের পুলিশ হেফাজত মঞ্জুর করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গণধর্ষণ, সম্পত্তি ছিনতাই এবং ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের ধারায় মামলা রুজু হয়েছে।
এই ঘটনায় রাজ্যজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। কিন্তু নির্যাতিতার বাবার সাম্প্রতিক মন্তব্যে কিছুটা বদলে গেছে পরিস্থিতির মোড়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তাঁর আস্থার বার্তা যেন রাজ্যের প্রশাসনের ওপর নতুন করে দায়িত্ব বাড়িয়ে দিল।



