দুর্গাপুজোর আবহে প্রায়ই আমরা শুনি— মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী। এমনকি অনেক পঞ্জিকাতেও দেখা যায় এই শব্দবন্ধ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ষষ্ঠী ও সপ্তমী আদৌ কি ‘মহা’ অভিধা পাওয়ার যোগ্য? শাস্ত্র, পুরাণ ও পণ্ডিতদের মতে তার উত্তর একেবারেই স্পষ্ট।
চতুর্থী থেকে দশমী— প্রতিটি দিনেই পূজার ভিন্ন আচার আছে। তবে মহা বিশেষণ কেবল দুই তিথির সঙ্গেই যুক্ত। সেগুলি হল অষ্টমী ও নবমী।


ষষ্ঠী: দেবীর বোধনের তিথি
কালিকাপুরাণে উল্লেখ রয়েছে— “বোধয়েদ্বিল্বশাখাসু ষষ্ঠ্যাং দেবী ফলেষু চ।” অর্থাৎ ষষ্ঠী তিথিতে বিল্বশাখা বা বেলগাছ দ্বারা দেবীর বোধন সম্পন্ন করতে হবে। এই দিনে মূলত বোধন, অধিবাস ও আমন্ত্রণ হয়।
কিন্তু ষষ্ঠীর সঙ্গে ‘মহা’ বিশেষণ যুক্ত হয়নি কোনও শাস্ত্রে। বরং এটিকে দেবীর আগমনের সূচনা হিসেবে ধরা হয়।
সপ্তমী: পূজার মূল সূচনা
শাস্ত্র অনুযায়ী, সপ্তমীর ভোরে দেবী দুর্গার পূজা শুরু হয়। “সপ্তম্যাং বিল্বশাখাং তামাহৃত্য প্রতিপূজয়েৎ।”— এই শ্লোকে স্পষ্ট বলা আছে সপ্তমীতে দেবীর পূজা করতে হবে।


তবে এখানেও ‘মহা’ অভিধা অনুপস্থিত। সপ্তমী মূলত পূজার প্রথম ধাপ হলেও, এর আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য অষ্টমী ও নবমীর মতো উচ্চ নয়।
কেন কেবল অষ্টমী ও নবমী ‘মহা’?
প্রসিদ্ধ স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন ভট্টাচার্য স্পষ্টভাবে বলেছেন— “দুর্গোৎসবের সকল তিথির পূর্বে মহা বিশেষণটি যোগ করা যায় না।”
তাঁর মতে—
-
অষ্টমী তিথি হল দেবীর আবির্ভাবের সময়। এই তিথিতেই ত্রিলোকের মহাবিপদ নাশ হয়। তাই একে বলা হয় মহাষ্টমী।
-
নবমী তিথি দেবীর মহাসম্পদ প্রদানকারী সময়। তাই এর নাম মহানবমী।
কালিকাপুরাণেও স্পষ্ট বলা হয়েছে—
-
“আশ্বিনস্য তু শুক্লস্য ভবেদ্ যা অষ্টমী তিথিঃ। মহাষ্টমীতি সা প্রোক্তা দেব্যাঃ প্রীতিকরী পরা।”
-
“ততেঽনু নবমী যা স্যাৎ সা মহানবমী স্মৃতা।”
অর্থাৎ আশ্বিন মাসের অষ্টমী হল দেবীর প্রীতিকরী তিথি— তাই এটি মহাষ্টমী। আর তার পরবর্তী নবমী হল সর্বলোকের পূজনীয়া তিথি— তাই মহানবমী।
‘মহা’ শব্দের আধুনিক প্রয়োগ
আধুনিক কালে অনেকেই ষষ্ঠী ও সপ্তমীর সঙ্গে মহা বিশেষণ যুক্ত করেন। এর প্রধান কারণ সাংস্কৃতিক প্রচলন ও পঞ্জিকার প্রভাব। তবে শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একেবারেই সঠিক নয়।
আসলে বাঙালি আবেগে ভর করে ‘মহাষষ্ঠী’ বা ‘মহাসপ্তমী’ বলেন, কিন্তু শাস্ত্র অনুযায়ী এদের জায়গা নেই।
শাস্ত্রীয় নিয়মে পূজার সমাপ্তি
শাস্ত্র মতে, দুর্গাপুজোর সমাপ্তি হয় নবমীতে। এরপর দশমী তিথিতে হয় বিসর্জন ও বিজয়া। দশমীর সঙ্গে কখনও মহা যুক্ত হয়নি। কারণ, এটি সমাপ্তির দিন, নতুন সূচনার প্রতীক।
তাহলে স্পষ্ট, ষষ্ঠী ও সপ্তমীকে ‘মহা’ বলা শাস্ত্রসম্মত নয়। এই অভিধা কেবল অষ্টমী ও নবমীর জন্য সংরক্ষিত। শাস্ত্র, পুরাণ ও পণ্ডিতদের ব্যাখ্যা মিলিয়েই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়।
কিন্তু সংস্কৃতি ও আবেগের জায়গায় আজও আমরা বলি— মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী। হয়তো সেটাই বাঙালির অনন্য উৎসবপ্রেম, যা শাস্ত্রের গণ্ডির বাইরে গিয়ে আবেগে মিশে গেছে।








