নজরবন্দি ব্যুরো: কলকাতার দুর্গাপুজোয় থিমের মণ্ডপ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক। ডিম বা জুতোর আদলে প্যান্ডেল নয়, প্রতিমার উপস্থাপনাতেও ‘বিকৃতি’ নয়—এমনই বার্তা দিয়েছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP)। তবে সংগঠনের দাবি, থিম-পুজোর বিরোধিতা তারা করছে না। তাদের আপত্তি এমন শিল্পভাবনায়, যা তাদের মতে দুর্গাপুজোর ধর্মীয় ভাবধারার সঙ্গে সম্পর্কহীন।
VHP-র কেন্দ্রীয় মার্গদর্শক মণ্ডলীর সদস্য স্বামী নির্গুণানন্দ ব্রহ্মচারীর বক্তব্য ঘিরেই মূলত এই বিতর্ক। তাঁর ব্যাখ্যা, থিম একটি উন্নত শিল্পকলা হতে পারে। কিন্তু সেই শিল্পের নামে ডিম, জুতো বা পুজোর সঙ্গে সম্পর্কহীন কোনও বিষয়কে মণ্ডপের মূল ভাবনা করে তোলার বিরোধিতা করছে সংগঠন।
অর্থাৎ মন্দির, ঐতিহ্য বা ভারতীয় সংস্কৃতির কোনও স্থাপত্যের আদলে মণ্ডপ তৈরি করলে আপত্তি নেই VHP-র। কিন্তু শুধুমাত্র চমক তৈরি করতে দুর্গাপুজোর সঙ্গে সম্পর্কহীন উপকরণ ব্যবহার করা নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। সংগঠনের বক্তব্য, থিম থাকুক, তবে তার সঙ্গে পুজোর ভাবধারার একটা যোগ থাকা প্রয়োজন।
আর এখানেই এসেছে প্রতিমার প্রসঙ্গ। নির্গুণানন্দ জানিয়েছেন, সাবেকি প্রতিমাই করতে হবে—এমন কোনও কথা তাঁরা বলেননি। প্রতিমায় আধুনিকতার ছোঁয়া থাকতেই পারে। তবে দেবীর মূর্তিতে শালীনতা ও ‘মাতৃত্বের ভাব’ বজায় রাখার উপর জোর দিয়েছেন তিনি।
বিশেষ করে দুর্গার পোশাক এবং হাতে থাকা অস্ত্র নিয়ে VHP-র বক্তব্য বেশ স্পষ্ট। সংগঠনের মতে, দুর্গার হাতে থাকা অস্ত্র সরিয়ে তার জায়গায় অন্য কোনও বস্তু বসানো কিংবা এমন পোশাক পরানো, যা প্রচলিত দেবীমূর্তির ভাবমূর্তিকে বদলে দেয়, তা গ্রহণযোগ্য নয়। ‘বিধবা শাড়ি’ পরিয়ে দুর্গার মূর্তি তৈরি করার মতো উপস্থাপনারও বিরোধিতা করা হয়েছে।
নির্গুণানন্দের বক্তব্য অনুযায়ী, সনাতন ধর্মে দুর্গার যে রূপের উল্লেখ রয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখেই প্রতিমার আধুনিক উপস্থাপনা হতে পারে। অর্থাৎ শিল্পীর স্বাধীনতা পুরোপুরি অস্বীকার করা হচ্ছে না, কিন্তু সেই স্বাধীনতারও একটি সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সীমারেখা থাকা উচিত—এটাই তাঁদের বক্তব্য।
মণ্ডপে আমিষ খাবার নিয়েও অবস্থান স্পষ্ট
দুর্গাপুজোর সঙ্গে বাঙালির খাওয়া-দাওয়ার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ফলে VHP-র বক্তব্যের আর একটি অংশ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—পুজোর সময় কি আমিষ খাবারও বন্ধ করার কথা বলা হচ্ছে?
নির্গুণানন্দের ব্যাখ্যা, গোটা বাংলায় দুর্গাপুজোর সময় আমিষ খাবার বন্ধ করার কোনও নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তাঁর বক্তব্য শুধুমাত্র পুজোমণ্ডপ এবং প্রতিমার আশপাশের পরিবেশ নিয়ে।
তাঁর মতে, যেখানে প্রতিমার পুজো হচ্ছে, সেই মণ্ডপের ভিতরে আমিষ খাবার বিক্রি বা খাওয়া না থাকাই কাম্য। মণ্ডপের বাইরে নির্দিষ্ট খাবারের জায়গায় আমিষ খাবার বিক্রি বা খাওয়া নিয়ে VHP-র কোনও নিষেধাজ্ঞার কথা তিনি বলেননি।
ভোগ কিংবা বলির বিষয়েও আলাদা করে কোনও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন নির্গুণানন্দ। তাঁর বক্তব্য, সাংবাদিক বৈঠকে তাঁকে বলি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়নি। পরম্পরা অনুযায়ী কেউ ছাগ বলি দিতে পারেন, আবার কেউ ফলমূল বলি দিতে পারেন—এমন কথাও তিনি বলেছেন।
‘থিম পুজোর বিরুদ্ধে নই’, দাবি VHP-র
VHP-র দক্ষিণবঙ্গ প্রান্তের প্রচার প্রসার প্রমুখ রক্তিম দাসও একই অবস্থান জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, সংগঠন কোনও ভাবেই থিম-পুজো বন্ধ করার কথা বলেনি। আপত্তি শুধুমাত্র ‘অশাস্ত্রীয়’ বা পুজোর ভাবধারার সঙ্গে অসঙ্গত থিমের ক্ষেত্রে।
রক্তিমের বক্তব্য, দুর্গাপুজোর ক্ষেত্রে শাস্ত্রীয় আচার এবং নির্দিষ্ট রীতিনীতি মেনে চলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিমা থেকে শুরু করে বিসর্জনের সময়—পুজোর বিভিন্ন রীতি নিয়ে নানা জায়গায় প্রশ্ন উঠছে বলেই সংগঠনের পক্ষ থেকে পুজো উদ্যোক্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছে।
তবে এই বক্তব্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্যও কম নয়। ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এটাই প্রথম দুর্গাপুজো। তার আগে কলকাতার বড় পুজো কমিটিগুলির সঙ্গে VHP-র আলোচনা এবং থিম, প্রতিমা ও মণ্ডপের পরিবেশ নিয়ে এই ‘মার্গদর্শন’ সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
বিশেষ করে কলকাতার দুর্গাপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হল শিল্পীর কল্পনাকে মণ্ডপ ও প্রতিমায় তুলে ধরা। বছরের পর বছর সামাজিক বার্তা, সমসাময়িক বিষয়, স্থাপত্যের অনুকরণ এবং নানা পরীক্ষামূলক শিল্পকর্মের মাধ্যমে থিম-পুজো নতুন মাত্রা পেয়েছে। সেই পরিসরে ধর্মীয় ভাবধারার সঙ্গে শিল্পের সীমারেখা কোথায় হবে, তা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়।
VHP অবশ্য বলছে, তাদের বক্তব্যকে থিম-পুজো নিষিদ্ধ করার দাবি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং তাদের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে পুজোর ধর্মীয় আবহ, প্রতিমার উপস্থাপনা এবং মণ্ডপের পবিত্রতা বজায় রাখার দাবি। ফলে এবার কলকাতার পুজোয় শিল্পী ও উদ্যোক্তারা এই বক্তব্যকে কতটা গুরুত্ব দেন, সেটাই নজরে থাকবে।
শেষ পর্যন্ত দুর্গাপুজোর মণ্ডপে থিমের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় ভাবধারা—দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে হয়, তা-ই ২০২৬-এর পুজোয় অন্যতম আলোচনার বিষয় হতে চলেছে। VHP তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে; এবার উত্তর দেওয়ার পালা পুজো উদ্যোক্তা ও শিল্পীদের।



