নজরবন্দি ব্যুরো: দেহদান নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর এবার নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিলেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, স্বাভাবিক মৃত্যুর পর দেহদান বন্ধ করতে তিনি বলেননি, বরং ব্রেন ডেথের ক্ষেত্রে দেহদানের বদলে অঙ্গদানের গুরুত্ব বোঝাতে চেয়েছিলেন। শনিবার যাদবপুরের কেপিসি মেডিক্যাল কলেজে (KPC Medical College) এক চিকিৎসা সম্মেলনে যোগ দিয়ে এই ব্যাখ্যা দেন তিনি।
বৃহস্পতিবার নিউ টাউনের (New Town) একটি চক্ষুদান সংক্রান্ত সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্য ঘিরেই বিতর্কের সূত্রপাত। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘‘দেহদান করে লাভ নেই’’ এবং সাধারণ মানুষকে গোটা দেহ দান না করে অঙ্গদানের দিকে এগোনোর আবেদন জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্যে চিকিৎসকমহল ও দেহদান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে।
সেই মন্তব্যেরই ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শনিবার শারদ্বত বলেন, তাঁর বক্তব্যের নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট ছিল ব্রেন ডেথ। তাঁর দাবি, কোনও রোগীর মস্তিষ্কের মৃত্যু ঘটেছে, কিন্তু ভেন্টিলেটর সাপোর্টে অঙ্গগুলি সচল রয়েছে—এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের উচিত দেহদান না করে অঙ্গদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথায়, ব্রেন ডেথের ক্ষেত্রে কিডনি, লিভার, হৃদ্যন্ত্রের মতো অঙ্গ প্রতিস্থাপনের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। তাই ওই পরিস্থিতিতে পুরো দেহ দান করার পরিবর্তে অঙ্গদানের গুরুত্ব বোঝাতেই তিনি মন্তব্য করেছিলেন বলে দাবি করেন।
তবে একইসঙ্গে শারদ্বত স্পষ্ট করে দিয়েছেন, স্বাভাবিক ভাবে মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তির ক্ষেত্রে মরণোত্তর দেহদানের প্রয়োজন নেই—এমন কথা তিনি বলেননি। তাঁর বক্তব্য, স্বাভাবিক মৃত্যুর পরে দেহদান মেডিক্যাল পড়ুয়াদের অ্যানাটমি শিক্ষার কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
বিতর্ক আরও বাড়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু (Jyoti Basu)-কে নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে। জ্যোতি বসুর মৃত্যুর পর তাঁর ইচ্ছানুযায়ী দেহ দান করা হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গ তুলে শারদ্বত দাবি করেছিলেন, তাঁর দেহ চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাজে লাগেনি; বরং ব্রেন ডেথের সময় অঙ্গদান হলে তা প্রতিস্থাপনের কাজে ব্যবহার করা যেত।
এই মন্তব্যের পরেই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কি স্বাভাবিক মৃত্যুর পরে দেহদান চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে আর গুরুত্বপূর্ণ নয়? কারণ মরণোত্তর দেহদান দীর্ঘদিন ধরে মেডিক্যাল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগে মানবদেহের গঠন ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পর্কে বাস্তব শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নতুন ব্যাখ্যা নিয়েও অবশ্য বিতর্ক পুরোপুরি থামছে না। দেহদান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ‘গণদর্পণ (Ganadarpan)’-এর সম্পাদক সুদীপ্ত সাহা রায় জানিয়েছেন, ব্রেন ডেথের ক্ষেত্রে অঙ্গদানের প্রয়োজনীয়তার কথা তাঁরাও বলেন। কিন্তু সেই বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতে জ্যোতি বসুর দেহদানের প্রসঙ্গ টেনে আনার প্রয়োজন ছিল না বলেই তাঁর মত।
অ্যানাটমির বর্ষীয়ান চিকিৎসক শিবশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর শনিবারের ব্যাখ্যার সঙ্গে নীতিগত ভাবে আপত্তি না থাকার কথা জানিয়েছেন। তবে তাঁর প্রশ্ন, যদি শুধুমাত্র ব্রেন ডেথের ক্ষেত্রে অঙ্গদানের প্রয়োজনীয়তার কথা বোঝানোই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে কৃত্রিম প্রযুক্তি বা মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদের প্রয়োজন নেই—এমন মন্তব্য কেন করা হল?
বৃহস্পতিবারের বক্তব্যে শারদ্বত আরও দাবি করেছিলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে থ্রি-ডি ইমেজের মাধ্যমে অ্যানাটমি শেখা সম্ভব এবং আমেরিকা ও ইউরোপে মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমেছে। এই বক্তব্যও চিকিৎসকমহলের একাংশের সমালোচনার মুখে পড়ে।
ফলে শনিবারের ব্যাখ্যায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেহদানকে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় বলার অবস্থান থেকে সরে এসে বক্তব্যের পরিধি ব্রেন ডেথের ক্ষেত্রে অঙ্গদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন। কিন্তু জ্যোতি বসুর দেহদান এবং অ্যানাটমি শিক্ষায় মরণোত্তর দেহের ভূমিকা নিয়ে তাঁর আগের মন্তব্য ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আপাতত পুরোপুরি থামছে না।



