রাজ্য রাজনীতিতে এক বিস্ফোরক মোড়। বিজেপি নেতা তথা প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতেই শুরু হয়েছে জোর চর্চা। তাতে দেখা যাচ্ছে এক ব্যক্তিকে, যিনি নাকি দিলীপ ঘোষ— এমন দাবি করেই শুরু হয়েছে তীব্র ‘কুৎসা’ প্রচার। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই ছবিগুলি কি আদৌ সত্যি? না কি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জাল? দিলীপ ঘোষের ঘনিষ্ঠ মহল স্পষ্ট ভাষায় বলছে, এই ছবি ও ভিডিও ‘ভুয়ো’ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের দাবি, “এটি পরিকল্পিত কুৎসা প্রচার। যিনি ভিডিওতে রয়েছেন, তিনি দিলীপ ঘোষ নন।”
চক্রান্তের সময়জ্ঞান বলছে অন্য গল্প
সম্ভবত সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হল— এই ‘ঘটনা’ প্রকাশ্যে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন দিলীপ ঘোষ বিজেপির বর্তমান রাজ্য নেতৃত্বের প্রতি প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানাচ্ছেন। প্রশ্ন তুলেছেন ২০১৯-এ ১৮টি আসন পাওয়া দল কীভাবে ২০২৪-এ এসে ১২-তে এসে ঠেকল? কেন কমছে জনভিত্তি? কারা দায়ী? এই সব প্রশ্নে দলের ‘প্রভাবশালী গোষ্ঠী’ অস্বস্তিতে পড়েছিল।
দিলীপ ঘোষের এই স্বরই সম্ভবত তাঁর ‘অপরাধ’। আর সেই অপরাধের ‘শাস্তি’ হিসেবেই কি এই ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি ফাঁস করে বদনাম করার চক্রান্ত? এমন প্রশ্ন উঠছে বঙ্গ রাজনীতির মহলে।
রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা, এবার ব্যক্তিগত আক্রমণ?
গত কয়েক বছরে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ধাপে ধাপে দিলীপ ঘোষকে দলের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরানো হয়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ নেতাদেরও মূলস্রোত থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এমনকী, এবার লোকসভা নির্বাচনের আগে তাঁর পুরনো আসন মেদিনীপুর থেকে প্রার্থী না করে, তাঁকে পাঠানো হয় দুর্গাপুরে। ফলত হার। এরপর কার্যত দলীয় বৈঠকে ডাকাও বন্ধ। এ সবকিছুর পেছনে রয়েছে একটা স্পষ্ট প্যাটার্ন— রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে দেওয়ার চেষ্টার পর এবার চরিত্র হননের খেলায় নেমেছে কেউ বা কারা। এবং অভিযোগ, এই সবটাই হচ্ছে দলের অন্দর থেকেই!
কে এই ‘মেঘনাদ’? গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দিলীপ-ঘনিষ্ঠদের ইঙ্গিত
দিলীপ ঘোষের ঘনিষ্ঠদের বক্তব্য, “দলের অন্দরেরই একটা প্রভাবশালী গোষ্ঠী চায় না দিলীপদা দলে গুরুত্ব পান। তাঁরা চান, শুধু একটা ‘হ্যাঁ-বলু’ নেতৃত্ব তৈরি হোক। যারা প্রশ্ন তোলে না, চ্যালেঞ্জ করে না।” এই ‘মেঘনাদদের’ বিরুদ্ধে তাঁদের অভিযোগ আরও গুরুতর— “লোকসভা ভোটের আগে দিলীপদার আসন কেড়ে নেওয়ার নেপথ্যে তারাই ছিল। বিয়ের সময় তাঁকে নিয়ে যেসব রসালো কটাক্ষ সোশাল মিডিয়ায় ছড়ানো হয়েছিল, তাতেও সেই গোষ্ঠীর হাত রয়েছে।” এখন, এই ‘ভুয়ো’ ভিডিও ফাঁসের পিছনেও সেই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাত রয়েছে বলেই তাঁদের দাবি।
কুৎসা নাকি চরম রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র?
এই ধরনের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও বা ছবি ফাঁস হলে, সাধারণত জনমানসে নেতার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু যদি তা ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি বা ভুয়ো হয়, তাহলে তা শুধু কুৎসা নয়, বরং এক চরম রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। এই ঘটনা নিছকই শালীনতা প্রশ্নে থেমে নেই। প্রশ্নটা এখন অনেক বড়— রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে গিয়ে নিজের দলের মধ্যেই এমন ঘৃণ্য কৌশল কি গ্রহণযোগ্য?
বিজেপির রাজ্য রাজনীতিতে এই ছবি ফাঁস এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিল। দিলীপ ঘোষ যতই এই ষড়যন্ত্রকে সামলানোর চেষ্টা করুন, তাঁর রাজনৈতিক লড়াই যে শুধু বাইরের দলের সঙ্গে নয়, দলের অন্দরেই একটা গোষ্ঠীর সঙ্গে তা এই ঘটনা ফের প্রমাণ করল।এখন সবার নজর এই প্রশ্নে— দলের ভিতরের এই ‘মেঘনাদ’দের মুখোশ কি সামনে আসবে? নাকি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের এই কাহিনি চাপা পড়ে যাবে আরও এক ‘ভুয়ো’ বিতর্কে?



