ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওষুধের পাশাপাশি জীবনযাত্রার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। শুধু ওষুধের উপর নির্ভর না করে প্রতিদিনের কিছু অভ্যাসে পরিবর্তন আনলে ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম ও পরিমিত খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ—ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বসিরহাট জেলা হাসপাতালের উপমুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডক্টর শ্যামল কুমার বিশ্বাসও জীবনযাত্রায় স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
নিয়মিত হাঁটা ও শরীরচর্চা
ডায়াবেটিস থাকলে শরীরকে সক্রিয় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওজন বেশি না হলেও নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন।
নিয়মিত হাঁটা বা উপযুক্ত শরীরচর্চা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে এবং ওজন ঠিক রাখতে সাহায্য করতে পারে। তাই একটানা দীর্ঘ সময় বসে না থেকে দিনের মধ্যে নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে কারও শরীরচর্চার ধরন ও মাত্রা তাঁর বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য অসুস্থতার উপর নির্ভর করতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
খাবারের তালিকায় আনুন পরিবর্তন
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাবারে পুষ্টিকর এবং তুলনামূলক কম চর্বি ও ক্যালোরিযুক্ত খাবার রাখার দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে।
খাদ্যতালিকায় পরিমাণমতো শাকসবজি, ফল এবং শস্যজাতীয় খাবার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে খাবারের পরিমাণ ও সময়ের দিকেও নজর রাখা জরুরি।
তবে প্রত্যেক ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্যতালিকা একরকম হওয়া উচিত নয়। বয়স, ওজন, রক্তে শর্করার মাত্রা, ওষুধ এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার উপর খাবারের প্রয়োজন বদলে যেতে পারে। তাই ব্যক্তিগত খাদ্যতালিকা তৈরির আগে চিকিৎসক বা ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও উপেক্ষা করা উচিত নয়। অতিরিক্ত মানসিক চাপ শরীরের বিভিন্ন হরমোনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে, যার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তাই দৈনন্দিন জীবনে স্ট্রেস কমানোর জন্য নিজের পছন্দের কাজে সময় দেওয়া, ধ্যান বা যোগব্যায়ামের মতো অভ্যাস করা যেতে পারে। তবে এগুলিকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।
মানসিক চাপ দীর্ঘদিন ধরে বেশি থাকলে বা তা দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলাও জরুরি।
পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলুন
অনিয়মিত বা অপর্যাপ্ত ঘুমও শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার অভ্যাস তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
রাতে নিয়মিত ভালো ঘুম শরীর ও মনের জন্য উপকারী। ঘুমের সমস্যা দীর্ঘদিন চললে তার কারণ খুঁজে বের করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সবচেয়ে জরুরি কথা, নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ নয়
জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা মানেই ডায়াবেটিসের ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ বা ইনসুলিন নেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস গড়ে তোলাই গুরুত্বপূর্ণ।
কখনও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা ভালো থাকলেও নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধের ডোজ কমানো বা বন্ধ করা ঠিক নয়। রক্তে শর্করার রিপোর্ট এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসকই ওষুধের প্রয়োজন ও মাত্রা নির্ধারণ করবেন।
ডায়াবেটিস দীর্ঘমেয়াদি একটি স্বাস্থ্যসমস্যা। তাই নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রাকে প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত করাই নিয়ন্ত্রণে থাকার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।



