দক্ষিণী অভিনেতা বিজয় রাজনীতিতে নেমে তামিলনাড়ুর ক্ষমতায় আসার পর এবার অভিনেতা ধনুষকে ঘিরেও রাজনৈতিক জল্পনা জোরালো হচ্ছে। রবিবার চেন্নাইয়ে নিজের অনুরাগী সংগঠনের মহিলা শাখার প্রায় ৩ হাজার সদস্য ও পদাধিকারীর সঙ্গে দেখা করেছেন ধনুষ। তার কয়েক দিন আগেই তাঁর অনুরাগী সংগঠনের নাম বদলে ‘ধনুষ নর্পণী ইযক্কম’ (Dhanush Narpani Iyakkam) রাখা হয়েছে। এই দুই ঘটনাকে ঘিরেই প্রশ্ন উঠছে, অভিনয়ের পাশাপাশি কি এবার রাজনীতির ময়দানেও পা রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি? তবে এখনও পর্যন্ত রাজনীতিতে যোগ দেওয়া বা নতুন দল গঠনের কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেননি অভিনেতা।
চেন্নাইয়ের সেম্মনচেরিতে একটি বেসরকারি কলেজে আয়োজিত ওই বৈঠকে বিভিন্ন জেলার মহিলা সদস্য ও সংগঠনের পদাধিকারীরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা ধনুষের সঙ্গে ছবি তোলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েক জনের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিনেতার ভাষণ ছিল সংক্ষিপ্ত; সেখানে কোনও রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়নি, বরং তিনি দীপাবলির শুভেচ্ছা জানান। সংবাদমাধ্যমকে অনুষ্ঠানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
বৈঠকে উপস্থিত মহিলাদের রুপোর কামাক্ষী প্রদীপ উপহার দেন ধনুষ। ওই প্রদীপে পদ্মফুলের নকশা ছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পদ্মফুল বিজেপির নির্বাচনী প্রতীক হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তবে প্রদীপের নকশা থেকেই ধনুষের রাজনৈতিক অবস্থান বা বিজেপির সঙ্গে তাঁর কোনও যোগসূত্র রয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো প্রমাণ সামনে আসেনি। অনুষ্ঠানে লাগানো পোস্টারে তাঁকে ‘থালাইভার’ অর্থাৎ নেতা বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক জল্পনার আর একটি কারণ তাঁর অনুরাগী সংগঠনের পুনর্গঠন। এত দিন সংগঠনটি ‘ধনুষ নর্পণী মন্দ্রম’ (Dhanush Narpani Mandram) নামে পরিচিত ছিল। সম্প্রতি সেটির নাম বদলে ‘ধনুষ নর্পণী ইযক্কম’ করা হয়েছে। নতুন নামের অর্থ মোটামুটি ‘ধনুষ জনকল্যাণ আন্দোলন’। সংগঠনের নতুন লোগোও প্রকাশ করা হয়েছে। তামিল রাজনীতিতে তারকা-অনুরাগীদের সংগঠনকে জনকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত করে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে নিয়ে যাওয়ার নজির থাকায় এই পরিবর্তনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন অনেকে।
এর আগে জুলাই মাসেও অনুরাগীদের উদ্দেশে ধনুষের বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। একটি রক্তদান শিবিরে তিনি অনুরাগীদের ঐক্যকে শুধু সিনেমার মুক্তি বা উদ্যাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজকল্যাণমূলক কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই বক্তব্যের পর থেকেই তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে সমাজসেবার আহ্বান এবং সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে নামার সিদ্ধান্ত—দুটি এক বিষয় নয়।
বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে ধনুষের বর্তমান পদক্ষেপের তুলনা টানার পিছনে রয়েছে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বিজয় নিজের অনুরাগী সংগঠন ‘বিজয় মাক্কল ইযক্কম’কে দীর্ঘদিন ধরে জনকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত রেখেছিলেন। পরে তিনি তামিলগা ভেত্রি কাজাগম (Tamilaga Vettri Kazhagam বা TVK) গঠন করে নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দলের সাফল্য দক্ষিণী চলচ্চিত্র জগতের অন্য তারকাদের রাজনৈতিক সম্ভাবনা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
তবে দুই অভিনেতার পরিস্থিতি এখনও এক নয়। বিজয়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল গঠন, সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের মতো একাধিক পদক্ষেপ স্পষ্ট ছিল। ধনুষের ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত অনুরাগী সংগঠনের পুনর্গঠন এবং জনকল্যাণমূলক কাজের উপর জোর দেওয়ার মতো ঘটনাই সামনে এসেছে। তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ, নির্বাচনী পরিকল্পনা কিংবা দল গঠনের বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই।
ধনুষকে ঘিরে জল্পনা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিক্রিয়াও সামনে এসেছে। তামিলগা ভেত্রি কাজাগমের মুখপাত্র এম সত্যকুমার জানিয়েছেন, বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রা অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে পারে। তবে তাঁর বক্তব্যে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক পরিশ্রমের গুরুত্বও উঠে এসেছে। অন্যদিকে, কংগ্রেস নেতা বি মাণিকম ঠাকুর ধনুষকে ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতার পিছনে বিজেপি ও আরএসএসের (RSS) কৌশল রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। এটি তাঁর রাজনৈতিক অভিযোগ; এর সমর্থনে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।
ধনুষের অনুরাগীদের একাংশও তাঁর সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রবেশের পক্ষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। মাদুরাইয়ে তাঁর অনুরাগী সংগঠনের সদস্যেরা উৎসবের সময়ে বিনামূল্যে অটো পরিষেবা দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, ধনুষ রাজনীতিতে এলে তাঁরা তাঁকে সমর্থন করবেন। তবে অনুরাগীদের এই আগ্রহকে অভিনেতার নিজের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে ধরে নেওয়া যায় না।
সব মিলিয়ে, ধনুষকে ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনার পিছনে রয়েছে সংগঠনের নাম পরিবর্তন, অনুরাগীদের সঙ্গে বৈঠক এবং জনকল্যাণমূলক কাজের উপর জোর দেওয়ার মতো কয়েকটি ঘটনা। কিন্তু এগুলির কোনওটিই এখনও তাঁর রাজনীতিতে প্রবেশের নিশ্চিত প্রমাণ নয়। অভিনেতা নিজে কোনও ঘোষণা না করা পর্যন্ত তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে তাঁর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে আলোচনা জল্পনার স্তরেই থাকবে।



