রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া ডিএ নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ডিএ কোনও দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি আইনি অধিকার—এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সঙ্গে বকেয়া সংক্রান্ত বিষয় খতিয়ে দেখতে নতুন কমিটি গঠনের নির্দেশ দিল শীর্ষ আদালত। রাজ্যের যুক্তি কার্যত খারিজ করে দিয়ে কর্মচারীদের দাবিকেই আইনের চোখে প্রতিষ্ঠা করল সুপ্রিম কোর্ট।
বৃহস্পতিবার ডিএ মামলার রায় পড়া শুরু করেন বিচারপতি সঞ্জয় কারোল। রাজ্যের আবেদন খারিজ করে আগেই সরকারি কর্মচারীদের পক্ষে রায় দিয়েছিল কলকাতা হাই কোর্ট। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করেই রাজ্য সরকার মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট–এ।
শুনানিকালীন তথ্য অনুযায়ী, আগেই শীর্ষ আদালত রাজ্যকে বকেয়া ডিএ–র অন্তত ২৫ শতাংশ মেটানোর নির্দেশ দিয়েছিল এবং তার জন্য ছ’সপ্তাহ সময়ও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই অর্থ মেটাতে পারেনি রাজ্য। পরে আরও ছ’মাস সময় চেয়ে আবেদন জানানো হয়। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতেই বিচারপতি সঞ্জয় কারোল ও বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র–র বেঞ্চে ২০২৫ সালের আগস্টে টানা শুনানি চলে। শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বর মাসে মামলার শুনানি শেষ হয়।
পুরনো রায়ই বহাল রইল সুপ্রিম কোর্টে। বৃহস্পতিবার আদালত স্পষ্ট জানায়, বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ মিটিয়ে দিতে হবে। মার্চের মধ্যে বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ দিতে হবে রাজ্য সরকারকে।
রাজ্য সরকারের অন্যতম যুক্তি ছিল—ডিএ কোনও স্থায়ী অধিকার নয় এবং কর্মস্থলভেদে ডিএ আলাদা হতে পারে। দিল্লি, কলকাতা বা গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার খরচ এক নয়, তাই এক হারে ডিএ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই বলেই দাবি করে রাজ্য। সেই সঙ্গে পুরনো কিছু সুপ্রিম কোর্টের রায়ের উদাহরণও তুলে ধরা হয়।
তবে শীর্ষ আদালত সেই যুক্তি স্পষ্ট ভাষায় খারিজ করে দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ, রাজ্য যে রায়গুলির কথা বলছে, সেগুলি কারখানার শ্রমিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল, যেখানে কোনও নির্দিষ্ট সার্ভিস রুল নেই। কিন্তু রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে স্ট্যাটিউটরি সার্ভিস রুল—আরওপিএ (ROPA)—স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। ফলে ওই উদাহরণ এই মামলায় প্রযোজ্য নয়।
আদালত আরও জানায়, রাজ্যের সব সরকারি কর্মচারী একই নিয়োগ প্রক্রিয়া ও একই নিয়মের আওতায় কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে ডিএ–তে বৈষম্য করার কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। এই বৈষম্য সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারার পরিপন্থী বলেও পর্যবেক্ষণ করে আদালত।
শুনানিতে রাজ্য সরকারের তরফে আর্থিক দুরবস্থার যুক্তিও তোলা হয়। বলা হয়, কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দিলে রাজ্য দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু আদালতের স্পষ্ট অবস্থান—আর্থিক চাপ থাকলেও আইনি অধিকার খর্ব করা যায় না।
সব মিলিয়ে, ডিএ মামলায় এই রায় রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য বড় স্বস্তির। বকেয়া মেটানোর পথে নতুন কমিটি গঠনের নির্দেশ কার্যত রাজ্যের উপর চাপ বাড়াল বলেই মনে করছে প্রশাসনিক মহল।



