অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত ‘অর্ণব’, ঝড়ের সর্বোচ্চ গতি ১৪০ কিমি! কোথায় আছড়ে পড়বে, বাংলায় কতটা বিপদ?

বঙ্গোপসাগরে শক্তি বাড়িয়ে অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত অর্ণব। ২৮ অক্টোবর অন্ধ্রপ্রদেশ ও ইয়ানাম উপকূলের কাছে স্থলভাগে প্রবেশের পূর্বাভাস, বাংলার একাধিক জেলায় বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

বঙ্গোপসাগরে শক্তি বাড়িয়ে অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে (Very Severe Cyclonic Storm) পরিণত হয়েছে ‘অর্ণব’। ভারতের আবহাওয়া দফতরের (India Meteorological Department বা IMD) সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ঝড়টির আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বুধবার, ২৮ অক্টোবর সকালে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ইয়ানাম উপকূলের মাঝে স্থলভাগে আছড়ে পড়তে পারে ঘূর্ণিঝড়টি। স্থলভাগে প্রবেশের সময় ঝড়ের সর্বোচ্চ দমকা হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এর প্রভাবে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গেও ভারী বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া এবং সমুদ্র উত্তাল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সোমবার রাতের আবহাওয়া বুলেটিনে ঘূর্ণিঝড়টির অবস্থান জানিয়ে আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, এটি পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরের উপর দিয়ে পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে এগোচ্ছিল। এরপর গতিপথ উত্তর-পশ্চিমমুখী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে অন্ধ্র উপকূলের দিকে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে ঝড়টির গতিপথ ও শক্তির উপর নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।

সোমবার রাতের বুলেটিনে ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্র ছিল বিশাখাপত্তনম থেকে প্রায় ৪৩০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বে এবং ওড়িশার গোপালপুর থেকে ৪৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ-পূর্বে। অর্থাৎ, উপকূলের দিকে এগোচ্ছে অর্ণব। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা পর্যন্ত পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে পরে উত্তর-পশ্চিম দিকে বাঁক নিতে পারে সেটি।

অন্ধ্রপ্রদেশের বাপটলা ও বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী উপকূল দিয়ে, ইয়ানামের কাছাকাছি, ঝড়টির স্থলভাগে প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে। তখন ঘণ্টায় ১১৫–১২৫ কিলোমিটার স্থায়ী গতিবেগে হাওয়া বইতে পারে। দমকা হাওয়ার গতি পৌঁছতে পারে ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারে।

ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ মাথায় রেখে কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরে বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (National Disaster Response Force বা NDRF), রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থাকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নিচু ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

অন্ধ্রপ্রদেশে ইতিমধ্যেই ঘূর্ণিঝড়ের মোকাবিলায় একাধিক সতর্কতামূলক পদক্ষেপ করা হয়েছে। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের (Reuters) ২৭ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার রাতের মধ্যে রাজ্যের প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরানো হয়েছিল। আরও বিপুল সংখ্যক বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। ঝড়ের আশঙ্কায় বিভিন্ন এলাকায় ট্রেন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটেছে।

ওড়িশার দক্ষিণের জেলাগুলিতেও সতর্কতা জারি রয়েছে। গঞ্জাম, গজপতি, রায়গাড়া, মালকানগিরি, কোরাপুট ও নবরংপুরের মতো জেলাগুলিতে প্রশাসন বিশেষ নজরদারি চালাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি নিচু এলাকায় জল জমা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্য প্রশাসনের তরফে প্রস্তুতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গেও অর্ণবের প্রভাব পড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আলিপুর আবহাওয়া দফতর। তবে ঘূর্ণিঝড়টি সরাসরি বাংলার উপকূলে আছড়ে পড়বে, এমন পূর্বাভাস নেই। মূল আশঙ্কা বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া এবং সমুদ্রের পরিস্থিতি ঘিরে। ২৭ থেকে ৩০ অক্টোবর দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবর দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় ভারী বৃষ্টি হতে পারে।

কলকাতা, হাওড়া, হুগলি এবং উত্তর ২৪ পরগনাতেও বৃষ্টি হতে পারে। উপকূলবর্তী এলাকায় ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে সমুদ্র উত্তাল হওয়ার আশঙ্কা থাকায় মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে যাঁরা মাছ ধরতে গিয়েছেন, তাঁদের নিরাপদে উপকূলে ফিরে আসার নির্দেশ রয়েছে। হুগলি, কলকাতা, হলদিয়া ও সাগরদ্বীপের বন্দরগুলিতেও সতর্কতামূলক সংকেত জারি রাখার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর।

উত্তরবঙ্গেও নজর রাখছে আবহাওয়া দফতর। ২৯ ও ৩০ অক্টোবর দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়িতে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় টানা বৃষ্টির জেরে ধস নামার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অর্ণবের প্রভাবে পূর্ব উত্তরপ্রদেশ ও বিহারেও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নিয়ে রাজ্যগুলিকে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় প্রশাসন।

ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও স্থলভাগে প্রবেশের সময় সামান্য বদলালেও উপকূলবর্তী অঞ্চলে তার প্রভাবের মাত্রা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দাদের স্থানীয় প্রশাসন এবং আবহাওয়া দফতরের সর্বশেষ নির্দেশিকা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর