সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম–এর সঙ্গে জনতা উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীরের বৈঠক ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে জল্পনা তুঙ্গে। তবে প্রশ্ন শুধু জোট সম্ভাবনা নিয়ে নয়—এই বৈঠককে কেন্দ্র করে কি সিপিএমের অন্দরেই মতভেদ প্রকাশ্যে চলে এল? বৃহস্পতিবার থেকেই সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক মহলে। একদিকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ব্যাখ্যা, অন্যদিকে প্রাক্তন মন্ত্রীদের সংযত কিন্তু স্পষ্ট আপত্তি—সব মিলিয়ে বাম শিবিরে মতের বিভাজন এখন আর আড়ালে নেই।
এই বিতর্কের মধ্যেই কড়া অবস্থান নিলেন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রবীন দেব। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত—সেলিমের সঙ্গে হুমায়ুনের বৈঠক কোনও ব্যক্তিগত উদ্যোগ নয়, দলীয় সিদ্ধান্তেই তা হয়েছে। রবীন দেবের কথায়, “মহম্মদ সেলিম সিপিএমের পলিটব্যুরোর সদস্য এবং রাজ্য কমিটির সম্পাদক। তিনি যখন কোনও কথা বলেন, সেটাই দলের সর্বোচ্চ বক্তব্য। অন্য কেউ কী বলল বা বলল না, তা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক।” তাঁর সংযোজন, কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালনা সম্পর্কে যাঁদের ধারণা স্পষ্ট, তাঁরা এ ধরনের প্রশ্ন তোলেন না। যাঁদের বোঝাপড়া অস্বচ্ছ, তাঁরাই ইচ্ছাকৃত ভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন বলে কটাক্ষ করেন রবীন।


তবে দলের ভিতরে এই প্রশ্নে একরকম সুর শোনা যাচ্ছে না। প্রাক্তন মন্ত্রী কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সিপিএম কোনও ভাবেই সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে জোট করবে না। তাঁর কথায়, “আমি এখনও পার্টির সদস্য। পার্টির সিদ্ধান্ত আমাকে মানতেই হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখছি, একটা বড় অংশ চাইছে বামপন্থীরা নিজেরাই লড়ুক।” কান্তির মতে, সিট সংখ্যা বড় কথা নয়, ভোটের শতাংশ বৃদ্ধি আসল বিষয়। তাঁর দাবি, সার্বিক জোট গড়া বাস্তবে খুবই কঠিন।
যদিও একই সঙ্গে দলীয় শৃঙ্খলার কথাও মনে করিয়ে দেন কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর সংযোজন, “শেষ পর্যন্ত পার্টি যা সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা সবাইকে মেনে চলতেই হবে।” এই বক্তব্যেই স্পষ্ট—ব্যক্তিগত মত থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রশ্ন তোলা হবে না।
এই পরিস্থিতিতে সুযোগ ছাড়েনি শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। কটাক্ষের সুরে তৃণমূলের মুখপাত্র তন্ময় ঘোষ বলেন, “বামপন্থী মানেই সিপিএম—এই ন্যারেটিভ সিপিএম নিজেরাই তৈরি করেছে। সিপিএম ছাড়াও গোটা পৃথিবীতে বহু বামপন্থী মানুষ আছেন।” তাঁর অভিযোগ, হুমায়ুনের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে সিপিএমের নেতাদের বক্তব্যেই প্রশ্ন উঠছে, দলটি আদৌ কতটা বামপন্থী আদর্শে অনড়। তন্ময়ের কটাক্ষ, “এখন তাঁদেরই নেতারা বলছেন, হুমায়ুনের সঙ্গে মিটিং করতেই পারেন। তাহলে কি শুধু ভোটে জেতার জন্য সব নীতি-আদর্শ সরিয়ে রাখা যায়?” বিজেপির দিকে অতীতে বাম ভোট শিফট হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি নিচুতলার গাঁটছড়ার কথাও মনে করিয়ে দেন।


সব মিলিয়ে সেলিম–হুমায়ুন বৈঠক শুধুই একটি রাজনৈতিক সাক্ষাৎ নয়, বরং আসন্ন ভোটের আগে বাম রাজনীতির দিশা ও আদর্শ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল। দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের বার্তা একরকম হলেও, ভেতরের ভিন্নমত যে ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে, তা আর অস্বীকার করার জায়গা নেই।







