পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে সিভিক ভলান্টিয়ার প্রশিক্ষণ নিয়ে নজিরবিহীন উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য পুলিশ। প্রায় দেড় দশক পর রাজ্যজুড়ে একসঙ্গে এমন বৃহৎ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হওয়ায় প্রশাসনিক মহলে আলোচনার ঝড় উঠেছে। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ, জঙ্গলমহল থেকে নদিয়া—একাধিক ব্যাটেলিয়নে চলছে এই বিশেষ প্রশিক্ষণ, যেখানে সিভিকদের শেখানো হচ্ছে আচরণ, আইনজ্ঞান, জনসংযোগ এবং দায়িত্ববোধ।
গত কয়েক বছরে বিভিন্ন ঘটনায় সিভিক ভলান্টিয়ারদের বিরুদ্ধে তোলাবাজি, দাদাগিরি, সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, এমনকি ভয়াবহ অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে এসেছে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই রাজ্য পুলিশ এবার চাইছে নতুন করে ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে। তাই সিভিক ভলান্টিয়ার প্রশিক্ষণ পর্বে জোর দেওয়া হচ্ছে—‘কি করতে হবে’ ছাড়াও ‘কি করা যাবে না’ তার ওপর।


এই প্রশিক্ষণ এখন ব্যারাকপুর, সালুয়া, বরজোড়া, রায়গঞ্জ, জলপাইগুড়ি, ডাবগ্রাম, দুর্গাপুর, আসানসোল, পুরুলিয়া, বীরভূমসহ উত্তর–দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জায়গায় চলছে। শুধুমাত্র পুরুষ সিভিকদেরই তোলা হয়েছে এই পর্বে, এখনও কলকাতা পুলিশের অধীনস্থ সিভিকরা প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন না। সব মিলিয়ে প্রায় আট হাজারেরও বেশি সিভিক এই দফায় প্রশিক্ষণের আওতায় আসছেন। রাজ্য পুলিশের এডিজি (ট্রেনিং) স্পষ্ট নির্দেশ পাঠিয়েছেন প্রতিটি জেলা পুলিশ সুপার ও কমিশনারকে—কোন জেলা থেকে কতজন সিভিক এই প্রশিক্ষণে যাবে।
সিভিক ভলান্টিয়ারদের ‘সভ্যতা-ভব্যতা’-র প্রশিক্ষণ, ভোটের আগে ভাবমূর্তি বদলাতে কড়া নজর!
প্রশিক্ষণের মূল বিষয় দুই ভাগে—শারীরিক কসরত ও আইন-শৃঙ্খলার পাঠ। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আচরণ ও শিষ্টাচার। সিভিকদের স্পষ্ট বলা হচ্ছে, তারা পুলিশের সহকারী মাত্র, পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার তাদের নেই। রাস্তায় গাড়ি থামানোর পরে কোনও নথি নিজেদের হাতে নেওয়া যাবে না। কোনও অফিসার যদি নির্দেশও দেন, তবুও বিনয়ের সঙ্গে জানাতে হবে—এটি সিভিক ভলান্টিয়ারের এক্তিয়ারে পড়ে না। আদালতের নির্দেশ ও পুলিশের ম্যানুয়াল অনুযায়ী নিজের অবস্থান কোথায়, তা বোঝানো হচ্ছে প্রত্যেক সিভিককে।

প্রশিক্ষণে আরও শেখানো হচ্ছে—সাধারণ মানুষের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে, আচরণ কতটা প্রফেশনাল হওয়া উচিত, উচ্চপদস্থ কর্তার সামনে কেমন আচরণ করা উচিত। প্রশিক্ষণের সময় বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সিভিক ভলান্টিয়ার প্রশিক্ষণ ব্যর্থ হলে সরাসরি ক্ষতি হবে পুলিশের ভাবমূর্তির।


ট্রাফিক বিভাগের সিভিক থেকে শুরু করে আইবি-র অধীন সিভিক—অনেকে ইতিমধ্যেই পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে ফেলেছেন। প্রশাসনের দাবি, পূর্বে কিছু থানায় বিক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ হলেও রাজ্য-স্তরের এমন কেন্দ্রীয় উদ্যোগ এই প্রথম। ফলে এই প্রস্তুতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা—এ কি ভোটের আগে ‘বদনাম’ ঘোচানোর বড় পরিকল্পনা?
গত কয়েক বছরে সিভিক ভলান্টিয়ারদের বিরুদ্ধে এমন অনেক ঘটনা সামনে এসেছে, যা পুলিশ প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্সাইড মোড়ে সাধারণ নাগরিককে রাস্তায় ফেলে মারধর, পাঁশকুড়ায় নাবালককে চোর সাজিয়ে মানসিক নির্যাতন, এমনকি আরজি কর হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার মূল অভিযুক্ত সিভিক—এসব মিলিয়ে জনমানসে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ—সিভিক বাহিনীর একটি বড় অংশ শাসকদলের ছত্রছায়ায় কাজ করে, ভোটের সময় তারা ব্যবহার হয় রাজনৈতিক স্বার্থে।
এই প্রেক্ষিতে পুলিশের একাংশ মনে করছেন, রাজ্যজুড়ে সিভিক ভলান্টিয়ার প্রশিক্ষণ শুরু করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁদের কথায়, জওয়ানরা বাহিনীর অংশ হলেও সিভিকরাও বাহিনীর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। ফলে তাদের ন্যূনতম প্রশিক্ষণ পাওয়া জরুরি। তবে আবার অনেকেই এটিকে ‘আইওয়াশ’ বলে কটাক্ষ করছেন। কারণ, পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণে চরিত্র, আচরণ বা নীতিবোধ কতটা বদলানো সম্ভব—সেই প্রশ্নও উঁকি দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে রাজ্যজুড়ে সিভিকদের এই প্রশিক্ষণ যে সাধারণ পদক্ষেপ নয়, তা স্পষ্ট। পুলিশের অন্দরমহলে অনেকেই স্বীকার করছেন—বিধানসভা ভোটের আগে সিভিকদের ভাবমূর্তি পাল্টানোর প্রয়াস সঠিক সময়ে নেওয়া হয়েছে। এখন সময়ই বলবে, এই বৃহৎ উদ্যোগ কি আদৌ বদলাতে পারে সিভিকদের জনসম্মুখে আচরণ ও প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতা।








