জনগণনার কাজে নিযুক্ত স্কুলশিক্ষকদের জন্য বড় স্বস্তির নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court)। বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের নির্দেশ অনুযায়ী, জনগণনার ডিউটি করলে তা শিক্ষকদের ‘অন ডিউটি’ হিসেবেই গণ্য করতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ক্ষেত্রে এই নির্দেশ প্রযোজ্য হবে। চারটি মামলার নিষ্পত্তি করে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, জনগণনার কাজের জন্য শিক্ষককে স্কুলের স্বাভাবিক পঠনপাঠনের বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, জনগণনা কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় কর্মী চেয়ে সংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রধানের কাছে আবেদন করবে। সেই আবেদনের ভিত্তিতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জনগণনার কাজে নিযুক্ত করবেন স্কুলের প্রধান। তবে এমন ভাবে দায়িত্ব বণ্টন করতে হবে, যাতে স্কুলের নিয়মিত পঠনপাঠন ব্যাহত না হয়। অর্থাৎ একই সময়ে শিক্ষককে ক্লাস নেওয়া এবং জনগণনার কাজ—দুই দায়িত্ব পালন করতে হবে না।
এই মামলার সূত্রপাত হয়েছিল জনগণনার কাজে স্কুলশিক্ষকদের নিয়োগ ঘিরে। ১৬ অগস্ট থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনগণনার তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। রাজ্যের তরফে আগে জানানো হয়েছিল, শিক্ষকরা স্কুলের সময়ের পরে অথবা সপ্তাহান্তে ছুটির দিনে জনগণনার কাজ করবেন। এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে একদল শিক্ষক কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।
মামলাকারী শিক্ষকদের মূল বক্তব্য ছিল, স্কুলের নিয়মিত কাজের পরে বা ছুটির দিনেও জনগণনার দায়িত্ব পালন করতে হলে তাঁদের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। অনেক শিক্ষককে বাড়ি থেকে দূরে গিয়ে স্কুল করতে হয়। আবার জনগণনার কাজের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা তাঁদের কর্মস্থল থেকে আরও দূরে হতে পারে। ফলে স্কুলের কাজ শেষ করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনগণনার দায়িত্ব পালন বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
আগের শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণা রাও এই বিষয়টি নিয়ে রাজ্যের পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, শিক্ষকদের স্কুলের দায়িত্ব সামলে কখন জনগণনার কাজ করতে হবে এবং তাঁরা কখন বাড়ি ফিরবেন, তা আগে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অনেক শিক্ষক ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত যাতায়াত করেন বলেও শুনানিতে উঠে এসেছিল।
আদালত একইসঙ্গে বিপুল সংখ্যক শিক্ষককে একসঙ্গে জনগণনার কাজে নামানোর পরিবর্তে বিকল্প ব্যবস্থার কথাও বলেছিল। প্রয়োজনে রোটেশন পদ্ধতিতে চার-পাঁচ জন করে শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এতে একদিকে জনগণনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাজ চলবে, অন্যদিকে স্কুলের পঠনপাঠনও সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে না।
এর আগে জনগণনা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল আদালত। কেন্দ্রীয় জনগণনা কর্তৃপক্ষ শিক্ষক নিয়োগের আগে রাজ্য সরকারের সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা করেছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছিল শুনানিতে। স্কুলের নির্ধারিত সময় এবং জনগণনার কাজের সময়ের মধ্যে কী ভাবে সমন্বয় করা হবে, তা নিয়েও আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল।
অন্যদিকে, রাজ্যের অবস্থান ছিল স্কুলের পঠনপাঠন যাতে ব্যাহত না হয়, সেই কারণে স্কুলের সময়ের পরে বা সপ্তাহান্তে জনগণনার কাজ করানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু আদালত সেই ব্যবস্থার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিশেষ করে সপ্তাহের কাজের পর একমাত্র ছুটির দিনেও শিক্ষকরা জনগণনার দায়িত্ব পালন করলে তাঁদের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে বলা হয়।
এখন আদালতের নতুন নির্দেশে সেই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পরিষ্কার হল। জনগণনার কাজে শিক্ষককে নিযুক্ত করা হলে সেটি তাঁদের সরকারি দায়িত্বের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হবে এবং ‘অন ডিউটি’ হিসেবে গণ্য হবে। ফলে এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শিক্ষকদের আলাদা করে ছুটির দিন বেছে নিতে হবে না—এমনটাই নির্দেশের মূল তাৎপর্য।
তবে জনগণনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাজ হওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও বজায় থাকছে। একইসঙ্গে স্কুলের পঠনপাঠন যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ফলে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এখন স্কুল প্রধানদের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। জনগণনা কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শিক্ষক বাছাই করে তাঁদের কাজের সময় এমন ভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে ক্লাসের উপর তার নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।
সব মিলিয়ে, জনগণনার দায়িত্বে থাকা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য কলকাতা হাইকোর্টের এই নির্দেশ গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তি আনল। স্কুলের কাজের পাশাপাশি ছুটির দিন বা অতিরিক্ত সময়ে জনগণনার দায়িত্ব পালনের যে প্রশ্নে এতদিন টানাপোড়েন চলছিল, আদালতের নির্দেশে তার একটি সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি হল। এখন সেই নির্দেশ বাস্তবে কী ভাবে কার্যকর করা হয়, সেটাই নজরে থাকবে।



