আমফান ত্রাণে ৩২ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি! ক্যাগ রিপোর্ট ঘিরে তীব্র বিতর্ক, রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে

আমফান-পরবর্তী ত্রাণ, নদীবাঁধ পুনর্নির্মাণ, তহবিল দাবি এবং উপভোক্তা নির্বাচন নিয়ে ক্যাগের রিপোর্টে একাধিক পর্যবেক্ষণ। রিপোর্ট প্রকাশের পর শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ঘূর্ণিঝড় আমফান (Amphan) বিধ্বস্ত সুন্দরবন (Sundarbans)-সহ উপকূলীয় বাংলার ক্ষত এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি। তার মধ্যেই কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (Comptroller and Auditor General of India – CAG)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে বিতর্ক। রিপোর্টে অভিযোগ করা হয়েছে, আমফান-পরবর্তী ত্রাণ, ক্ষয়ক্ষতি এবং নদীবাঁধ পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে তৎকালীন রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত দাবি পেশ করেছিল। পাশাপাশি ত্রাণ বণ্টন, উপভোক্তা নির্বাচন এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে একাধিক আর্থিক ও প্রশাসনিক অসঙ্গতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বাকযুদ্ধ।

গত ২৫ জুলাই প্রকাশিত ক্যাগ রিপোর্টে বলা হয়েছে, সুপার সাইক্লোন আমফানে সুন্দরবন ও সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তুলে ধরে কেন্দ্রের কাছে আর্থিক সহায়তা চাওয়ার সময় পরিকাঠামো এবং নদীবাঁধ পুনর্নির্মাণের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দেখানো হয়েছিল। রিপোর্ট অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত দাবির পরিমাণ প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা।

রিপোর্টে আরও একাধিক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। ক্যাগের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ১৭৫টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মোট ১২৫.০৭ কোটি টাকার লেনদেনে অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ত্রাণ ও ক্ষতিপূরণের কিছু অর্থ প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছেছে।

এছাড়া আবাসন অনুদান বণ্টনেও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। ক্যাগের দাবি, ৯,২২৬ জন ভুয়ো বা একাধিকবার নথিভুক্ত উপভোক্তার নামে মোট ১৮.০৭ কোটি টাকার অনুদান বিতরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২০ সালের আমফান ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্দ অর্থের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের ঘূর্ণিঝড় বুলবুল (Bulbul)-এর পুরনো উপভোক্তা তালিকা ব্যবহার করে ৫,৬২৭ জনের মধ্যে ২.৮২ কোটি টাকা বিতরণের অভিযোগও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, নদীবাঁধ নির্মাণের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ক্যাগ। রিপোর্টে বলা হয়েছে, একাধিক স্থানে প্রকল্প অনুমোদিত নকশা (DPR)-এর তুলনায় বাঁধের উচ্চতা ও ঢালের পরিমাপ কম ছিল। পাশাপাশি নদীর ভাঙনপ্রবণ এলাকায় প্রয়োজনীয় মানের পরিবর্তে তুলনামূলক পাতলা বোল্ডার পিচিং ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

ক্যাগ আরও উল্লেখ করেছে, সুন্দরবনের গোসাবা, সাগর, বাসন্তী, কুলতলি এবং ক্যানিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নদীবাঁধ মেরামতের একাধিক প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থের বড় অংশ ব্যয় হলেও বহু কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। এছাড়া উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি অর্থ স্থানান্তর (DBT)-এর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত যাচাই ও নজরদারির অভাব ছিল বলেও রিপোর্টে মন্তব্য করা হয়েছে। পরিবেশগত দিক থেকেও অনুমোদন ছাড়া বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণের সময় কিছু ম্যানগ্রোভ অরণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

রিপোর্ট প্রকাশের পর সুন্দরবনের একাংশের বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, ঘূর্ণিঝড়ের পরে পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি। সংবাদমাধ্যমের সামনে এক ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা দাবি করেন, বাড়ি ভেঙে যাওয়ার পরেও প্রয়োজনীয় ত্রাণ মেলেনি এবং অত্যন্ত কষ্টে দিন কাটাতে হয়েছে।

অন্যদিকে, ক্যাগ রিপোর্ট নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)-এর নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় ভিন্ন সুর শোনা গিয়েছে। সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee) জানান, সংশ্লিষ্ট সময়ে দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীরাই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন। দলের নেতা কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh) বলেন, রিপোর্টে তথ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনও পক্ষপাত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অপরদিকে বিজেপি (Bharatiya Janata Party)-র রাজ্য মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার (Debjit Sarkar) ক্যাগ রিপোর্টের ভিত্তিতে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে ত্রাণ বণ্টনে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ক্যাগের রিপোর্টে উল্লিখিত পর্যবেক্ষণগুলি একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনের অংশ। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলির বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি বা বিচারিক সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন